চট্টগ্রাম, , মঙ্গলবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

দূর্বিসহ জীবন: জিরো পয়েন্টে রোহিঙ্গাদের শেষ সম্বলটুকুন ছিনিয়ে নিচ্ছে দূর্বৃত্তরা

প্রকাশ: ২০১৭-০৮-৩১ ১৬:২১:০৯ || আপডেট: ২০১৭-০৮-৩১ ১৭:৩৫:৩৬

ইমাম খাইর
সীমান্ত এলাকা থেকে

উগ্রপন্থা দমনের অজুহাতে বোমা মেরে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনী। জঙ্গিগোষ্ঠীর সদস্য দাবি করে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আরাকানের মুসলিম অধ্যূষিত এলাকার তরুণদের।

রোহিঙ্গারা বলছেন, তারা উভয় সঙ্কটে পড়েছেন। নিজ দেশ মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর সেনা, পুলিশ ও মগদের গুলির ভয়, এপারে এসে আশ্রয়হীন। পেটে ভাত নেই। নেই থাকার রসদপাতি। পিতা-মাতা, স্বামী-স্বজন কোথায় নিজেরা জানেনা। জীবন বাঁচাতে পাহাড় জঙ্গল, সাগর পেরিয়ে এপারে এসেছে রোহিঙ্গারা। নিজ দেশে বর্মী বাহিনীর নিপীড়ন ও সীমান্ত পার হলে বিজিবির বাধা। জিরো পয়েন্টে খোলা আকাশের নিচেই তাদের আশ্রয়স্থল। শেষ সম্বল কাপড়-চোপড়, গরু-ছাগল পর্যন্ত ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে দুর্বৃত্তরা।

সরেজমিন দেখা গেছে, আরাকানে অরাজকতার পর থেকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের জিরো পয়েন্ট অবস্থান নিয়েছে অনেক নারী ও শিশু। সীমান্তের ঘুমধুম, আমতলী, তুমব্রু, বাইশপাড়ি, জলপাইতলী, বেতবুনিয়া, কলাবাগান এলাকায় অন্যবারের চেয়ে এবার রোহিঙ্গাদের ¯্রােত লক্ষণীয়। নারীরা ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের নিয়ে প্রাণের ভয়ে পালিয়ে এসেছেন।
তবে অভিযোগ উঠেছে, রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আনা গরু, ছাগল, মুরগি স্থানীয় কতিপয় সুবিধাভোগী পানির দরে কিনে নিচ্ছে। রোহিঙ্গারাও সেগুলো বাড়তি বোঝা দেখে তর্ক ছাড়াই হাতবদল করছে। পরে অপেক্ষমাণ ইজিবাইক ও অন্যান্য গাড়িতে করে তারা নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (৩১ আগষ্ট) সকালে ৭৫ বছরের বৃদ্ধ মিয়ানমারের লেইনছ্পিাড়া এলাকার নবী হোসন ৬ টি গরু নিয়ে রেজু আমতলী সীমান্ত দিয়ে এপারে আসলে গরুগুলো ছিনিয়ে নেওয়া হয়। অনেক আকুতি মিনতির পরও শেষ সম্বল গরুগুলো ফেরত দেয়নি মানুষরূপী ওই দুই পা বিশিষ্ট জন্তুরা। একই এলাকা থেকে তিন মহিলার ৮টি গরু ছিনিয়ে নিয়েছে স্থানীয় কিছু দুর্বৃত্ত। তাদের আর কোন সহায় সম্বল নেই। বৃষ্টিতে ভিজে আহাজারী করছে। কিন্তু তাঁদের আহাজারী দেখার কেউ নেই।

মিয়ানমারের ফকিরাবাজারের নুরুল কবির অভিযোগ করেন, বহু কষ্টে চারটি গরু জিরো পয়েন্টে আনেন। কিন্তু কিছু যুবক তা লুট করে নিয়ে যায়। তার সঙ্গে আরও পাঁচ পরিবার ছিল।
ঘুমধুম সীমান্ত এলাকা ঘুরে আরও দেখা যায়, ঘুমধুম ইউনিয়নের আজুখাইয়া ও রেজু আমতলিতে অসংখ্য টমটম রোহিঙ্গাদের পরিবহনের জন্য অপেক্ষা করছে। ক্যাম্প এলাকায় পৌঁছাতে তারা জনপ্রতি ১০০ টাকা করে হাতিয়ে নিচ্ছে। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে থাকা গরু-ছাগল স্থানীয় কিছু যুবক পানির দামে কিনে নিচ্ছে।

এদিকে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য মতে, গত এক সপ্তাহে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গার সংখ্যা ১৮ হাজার ছাড়িয়েছে। সংস্থাটির কক্সবাজার কার্যালয়ের প্রধান সংযুক্তা সাহানী এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

তিনি জানান, যারা প্রবেশ করেছে তাদের মধ্যে অধিকাংশই নারী ও শিশু। তাদের খাদ্য ও অন্যান্য সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে। যারা নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান করছেন তাদের খাবার ও অন্যান্য সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে।

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা নুর বেগম বলেন, আমার চোখের সামনে স্বামী ওমর ফারুক (২১)কে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। জালিয়ে দিয়েছে আমাদের বসতবাড়ী। আমাকেও নির্মমভাবে নির্যাতন করেছে পাষান বাহিনী। পাশের বাড়ির এক নবজাতকেও তারা নির্মমভাবে হত্যা করেছে। আমি কোন মতে ৫ বছরের সুমাইয়া ও ১ বছরের হালিমাকে কোলে নিয়ে পালিয়ে এসেছি। আমার দুই শিশু ছাড়া আর কেউ বেঁচে নেই পৃথিবীতে। নুর বেগমের প্রশ্ন, কিভাবে বেঁচে থাকবো এই অবুঝ দুই শিশুকে নিয়ে? কোথায় পাবো মাথা গুজানোর ঠাঁই। নুর বেগমের বাড়ী মংডুর ঢেকিবনিয়া মিয়ার পাড়ায়। মিয়ানমার সীমান্ত এলাকা ঘুমধুম জলপাইতলী জিরোপয়েন্ট গেলে সেখানে কথা হয় তার সাথে। গত শুক্রবার ভোরে পাহাড় জঙ্গল পেরিয়ে বাংলাদেশ সীমানায় ঢুকে পড়ে নুর বেগম।

কথা হয় ৬০ বছর বয়সী রোহিঙ্গা নারী মেহেরুন্নেছার সঙ্গে। তিনি বলেন, রাখাইনে আর যাওয়া হবে না। কারণ, সেনাবাহিনী পুরো রাখাইনজুড়ে তান্ডব চালাচ্ছে। হেলিকপ্টার চক্কর দিয়ে রাখাইনের বিভিন্ন গ্রামে বোমা ফেলছে। একের পর রোহিঙ্গা বসতভিটা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। রোহিঙ্গা অধ্যূষিত এলাকাগুলোর চারিদিকে শুধুই ধ্বংসের চিহ্ন।

প্রসঙ্গত, গত ২৪ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে পুলিশ পোস্টে হামলা চালায় সে দেশের একটি বিদ্রোহী গ্রুপ। এতে ১২ পুলিশ সদস্যসহ অনেক রোহিঙ্গা হতাহত হন। এঘটনার পর প্রতিদিনই বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে আসছে অসংখ্য রোহিঙ্গা। নাফ নদীর জলসীমানা থেকে শুরু করে স্থল সীমানা পার হয়ে জিরো পয়েন্টে অবস্থান নিয়েছে হাজার হাজার রোহিঙ্গা। এর আগে গত বছরের ৯ অক্টোবরের পর থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে একইভাবে হামলার ঘটনা ঘটে। তখন প্রাণ ভয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে প্রায় ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা। এরপর আন্তর্জাতিক মহল নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করে মিয়ানমার সরকারের ওপর। কিন্তু এর কোনও তোয়াক্কা না করে রাখাইনে ফের সেনা মোতায়েন করলে বিদ্রোহী গ্রুপের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে সে দেশের সেনা বাহিনী ও পুলিশ।

আপনার মতামত দিন...

ক্যালেন্ডার এবং আর্কাইভ