চট্টগ্রাম, , সোমবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

মিয়ানমারের প্রতি রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধের আহবান প্রধানমন্ত্রীর

প্রকাশ: ২০১৭-০৯-১২ ১৭:৪৫:১০ || আপডেট: ২০১৭-০৯-১৩ ০৯:০৯:১০

ইমাম খাইর
কক্সবাজার ব্যুরো

নিরীহ রোহিঙ্গা নাগরিকদের ওপর জুলুম, নির্যাতন, হত্যা বন্ধ করতে মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, আমরা মিয়ানমার সরকারের কাছে অনুরোধ করব, তারা যেন নিরীহ মানুষের উপর নির্যাতন বন্ধ করে। তারা যেন প্রকৃত দোষীদের খুঁজে বের করে। এক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে যা যা সাহায্য করা দরকার, আমরা তা করব।

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতনে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মানবিক দিক বিবেচনায় বাংলাদেশে দিলেও এ দেশের ভূমি ব্যবহার করে কোনো ধরনের সন্ত্রাসী তৎপরতা চালানো হলে তা বরদাশত করা হবে না বলেও হুঁশিয়ার করেছেন সরকারপ্রধান।

মঙ্গলবার (১২ সেপ্টেম্বর) বেলা পৌঁনে ১২টার দিকে কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালংয়ে নিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে জনসভায় তিনি এ কথা বলেন। এর আগে বেলা সোয়া ১০টার দিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বিমানে করে তিনি কক্সবাজার বিমানবন্দরে পৌঁছান। সেখান থেকে গাড়ি বহরে কুতুপালংয়ের উদ্দেশে রওনা হন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তিনি ক্যাম্পে পৌঁছান।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে এসে কুতুপালং ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া নারী, পুরুষ, শিশুদের সঙ্গে কথা বলেন শেখ হাসিনা। পরে তিনি সেখানে সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা করেন এবং শরণার্থীদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেন। শরণার্থীদের মুখ থেকে দুর্দশার কথা শুনে প্রধানমন্ত্রীর চোখ ভিজে ওঠে। তার সঙ্গে থাকা ছোট বোন শেখ রেহানাও এ সময় আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন।
মিয়ানমারে যা ঘটছে, তাকে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ হিসেবে বর্ণনা করে প্রধানমন্ত্রী বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘এ ঘটনা দেখে চোখের পানি ধরে রাখা যায় না। মানুষ মানুষের মতো বাঁচবে। মানুষের কেন এত কষ্ট!’

মিয়ানমারের আইন পরিবর্তন করে ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আইন পরিবর্তন করে কেন এই ঘটনার সৃষ্টি করা হল?’

‘এই ঘটনা না ঘটলে নিরীহ মানুষের উপর অত্যাচার হত না। ভুক্তভোগী কারা? নিরীহ মানুষ। কীভাবে তাদের উপর অত্যাচার হয়েছে! এই অবস্থা সত্যি সহ্য করা যায় না। কেন এই অত্যাচার? তারা তো তাদের নিজেদের দেশেরই লোক।’

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, স্বজন হারানোর বেদনা আমি বুঝি, ঘরবাড়ি হারিয়ে আপনারা যারা এখানে এসেছেন তারা সাময়িক আশ্রয় পাবেন। তবে আপনারা যাতে নিজে দেশে ফেরত যেতে পারেন সে ব্যাপারে মিয়ানমারকে বলব।

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের খাদ্য, আশ্রয় দেওয়া হচ্ছে। আমি রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে আহ্বান জানাচ্ছি। তবে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে আমাদের যা করার দরকার আমরা সেটি করবো।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন আমাদের ওপর হামলা করেছিল, সেসময় আমরা ঘরবাড়ি ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। একসময় হানাদার বাহিনীরা আমাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছিল এবং গণহারে হত্যা করেছিল। ঠিক একইভাবে মিয়ানমার সরকার রাখাইন রাজ্যে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের ওপর দমন, নিপীড়ন শুরু করেছে। সেখানে তাদের বাড়িঘড় জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে লাখ লাখ রোহিঙ্গা আমাদের দেশে আশ্রয় নিয়েছে। আমরা তাদেরকে সাময়িক সময়ের জন্য আশ্রয় দিয়েছি। আমরা মিয়ানমার সরকারকে অনুরোধ করছি, দমন ও নিপীড়ন বন্ধ করে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়া হোক। এ বিষয়ে আমরা কমিটিও করে দিয়েছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মিয়ানমারে যেভাবে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে তাতে কি তাদের বিবেককে নাড়া দেয় না? একজনের ভুলে এভাবে লাখ লাখ মানুষ ঘরহারা হচ্ছে। আমরা শান্তি চাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ১৬ কোটি মানুষের দেশ। সবার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছি। সেখানে আরও ২/৫/৭ লাখ মানুষকেও খেতে দিতে পারবো।’

এ সময় তিনি স্থানীয়দের উদ্দেশে বলেন, ‘এখন যারা যুবক তারা হয়তো মুক্তিযুদ্ধ দেখেননি। কিন্তু আমরা দেখেছি। তাই রোহিঙ্গাদের যেন কোনও কষ্ট না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।’
প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি জেনেছি আশ্রয় গ্রহণকারী অনেকেই অসুস্থ। তাদের দ্রুত চিকিৎসা ব্যবস্থা করুন। রোহিঙ্গাদের যেন কোনও কষ্ট না হয় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেন ভালো থাকে সেজন্য প্রশাসনকে সহযোগিতা করতে সবাইকে অনুরোধ জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘বেসরকরি সংস্থা বা অন্য কোনও সংগঠন রোহিঙ্গাদের ত্রাণ বা সাহায্য সহযোগিতা করতে চাইলে তা জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকটের সুযোগ নিয়ে কেউ যেন কোনও ধরনের বাণিজ্য করতে না পারে সে ব্যাপারে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।’

এ সময় বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ রেহানা ছাড়াও তার পুত্রবধূ আইওএম কর্মকর্তা পেপ্পি সিদ্দিক এ সময় কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে উপস্থিত ছিলেন।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, পূর্ত মন্ত্রী মোশাররফ হোসেন, ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ, হুইপ ইকবালুর রহিম, কক্সবাজার-৩ আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল, আবু রেজা মোহাম্মদ নিজামউদ্দিন নদভী, মন্ত্রী পরিষদ সচিব শফিউল আলম, মুখ্য সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী সকালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উখিয়ায় পৌঁছেন।

এছাড়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, কক্সবাজারের সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদি এবং সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক, পুলিশ মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক ও র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদও উখিয়ায় উপস্থিত ছিলেন।

গত ২৪ আগষ্ট রাতে মিয়ানমারের কয়েকটি সেনা ও পুলিশের চৌকিতে রোহিঙ্গা ‘জঙ্গি’দের হামলার অভিযোগে আরাকান রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন শুরু করে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী। হত্যা, ধর্ষণের পাশাপাশি গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এই অবস্থায় গত দু’সপ্তাহে অন্তত সােেড় তিন লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনের দেয়া তথ্যানুযায়ী আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা ২ লাখ ৭০ হাজারের বেশি।

রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সেনাবাহিনীর দীর্ঘদিন ধরে চলমান সংঘর্ষ-সহিংসতা সঙ্কট সমাধানে ২০১৬ সালের আগস্টে গঠিত হয় অ্যাডভাইজরি কমিশন অন রাখাইন স্টেট। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে ওই কমিশন এক বছরের তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দলের প্রধান অং সান সু চির কাছে জমা দেয় চলতি বছরের ২৪ আগস্ট।

৬৩ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদন জমা দেয়ার কয়েক ঘণ্টা পরই ২৪ আগস্ট দিবাগত রাতে ত্রিশটি পুলিশ ও সেনাচৌকিতে রহস্যজনক হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় নিহত হয় নিরাপত্তা বাহিনীর ১২ সদস্য। তারপরই হামলার জন্য রোহিঙ্গা ‘জঙ্গি’দের দায়ী করে জবাব হিসেবে সেনাবাহিনী পুরো অঞ্চলে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে।

সেনাবাহিনীর ওই হামলায় এখনও পর্যন্ত ৪শ’র বেশি মানুষ মারা গেছে, আর প্রাণভয়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে পাড়ি জমাচ্ছে বাংলাদেশে। নৌপথে পালিয়ে আসার পথে নৌকাডুবিতেও বাড়ছে মৃতের সংখ্যা।

এই শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বার বার আহ্বান জানানো হলেও মিয়ানমার তাতে সাড়া দেয়নি। রোহিঙ্গাদের নিজেদের নাগরিক হিসেবে মেনে নিতেও তারা রাজি নয়।
রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিয়ে নাগরিকত্ব দিয়ে নিরাপদে বসবাস করার সুযোগ করে দিতে মিয়ানমারের ওপর কূটনৈতিক চাপ দেওয়ার একটি প্রস্তাব সোমবার বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়।

রোহিঙ্গাদের এই স্রোত ঠেকাতে মিয়ানমারে জাতিসংঘের মতো কোনো একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার তত্ত্বাবধানে একাধিক নিরাপদ এলাকা (সেইফ জোন) গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে বাংলাদেশ। এছাড়া সীমান্তে যৌথ টহলেরও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে। কিন্তু কোনো প্রস্তাবেই মিয়ানমারের সাড়া মেলেনি।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন না করার উদ্দেশ্যেই মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এই হত্যাকা- শুরু করে।

 

আপনার মতামত দিন...

ক্যালেন্ডার এবং আর্কাইভ