চট্টগ্রাম, , সোমবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

বাংলাদেশ আশ্রয় না দিলে এতোদিনে সলিল সমাধি হতো রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের

লিখেছেন : সাঈফী আনোয়ারুল আজিম, উখিয়া থেকে ফিরে

প্রকাশ: ২০১৭-০৯-১২ ২৩:৫২:৪৩ || আপডেট: ২০১৭-০৯-১৩ ০৯:২১:০৭

বাংলাদেশের মানুষ বড়ই উদার। তাদের অবদানের কথা কখনোই ভূলবেনা এদেশে আশ্রয় নেয়া লাখ লাখ শরণার্থী রোহিঙ্গা মুসলিম নারী পুরুষ। গতকাল উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী শিবিরগুলোতে গিয়ে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা মুসলিদের সাথে কথা বলে এ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের লোকজন। আশ্রয় ক্যাম্পের ডজন খানেক ব্যক্তির কাছে জানতে চাওয়া হয়, বাংলাদেশকে তারা এখন কোন দৃষ্টিতে দেখছেন। প্রতিউত্তরে তারা জানান, বাংলাদেশ আমাদের একমাত্র আশ্রয়স্থল। আমাদের সাহায্যকারী রাষ্ট্র। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নির্যাতনে প্রাণ বাঁচাতে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আস্থার জায়গা এখন বাংলাদেশ। তারা মনে করেন, বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়ে জীবন বাঁচিয়েছেন, এদেশের সাধারণ জনগণ ত্রাণ দিয়ে ক্ষুধা নিবারণ করেছেন। দেশের সরকার ও সাধারণ মানুষের উদারতার কথা স্বরণ করে বলেন, আমাদেরকে প্রতিবেশি কোনো রাষ্ট্র আশ্রয় দেয়নি। কিন্তু বাংলাদেশ আমাদেরকে আশ্রয় দিয়েছে। এটা আমাদের মনে থাকবে চিরদিন। এ অবদানের কথা কখনো ভূলবেনা রোহিঙ্গা মুসলিম সম্প্রদায়।

গত ২৭ আগস্ট থেকে উখিয়ার পালংখালী নতুন শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন আবুল হোসেন(৭৫)। তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, দেখুন সারা দুনিয়ার মধ্যে আমাদের চেয়ে নির্যাতিত ও নিপীড়িত কোনো জাতি নেই। এ পৃথিবীতে আমরা এক অসহায় সম্প্রদায়। আজ বার্মার বাহিনী আমাদের উপর বর্বর অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে। আমাদের এই করুণ অবস্থায় আমরা যদি বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারতাম , তাহলে বার্মা সরকার পুরো রোহিঙ্গা জাতিকে স্বমূলে ধ্বংস করে দিতো। এতোদিনে হয়তো রোহিঙ্গা জাতির সলিল সমাধি হতো।

একই কথা জানালেন ৫৫ বছরের বৃদ্ধা কানিছা খাতুন। তিনি জানান, আমরা বাংলাদেশের অবদানের কথা ভূলতে পারবোনা। আমরা এদেশের মানুষের কাছে আজীবন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে যাবো। এই বৃদ্ধা মহিলা আরও আরও জানান, আমাদের ভবিষ্যত প্রজম্মের কাছে লিখে যাবো, বাংলাদেশ নামক দেশটাকে যুগ যুগ ধরে স্বরণ রাখতে। এদেশের মানুষের অবদানের কথা আজীবন মনে রাখতে।

মংড়– থেকে আগত শরণার্থী হাবিবুল জানান, আমরা এদশের মানুষের কখা ভূলতে পারবোনা। এদেশের মানুষ আমাদেরকে আশ্রয় দিয়েছে। মাথা গোঁজার ঠাই দিয়েছে। আমাদেরকে বেচে থাকার সুযোগ দিয়েছে। তিনি জানান, এখন আমাদের কাজ হবে এই অবদানের কথা যুগ যুগ ধরে স্বরণে রাখা।

কুতুপালং নতুন শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়া কাশেম জানান, বার্মার বাহিনী যখন আমাদের উপর বর্বর হামলা শুরু করে, তখনতো আমরা আশ্রয়ের জন্য বাংলাদেশের বিকল্প কিছু ভাবতে পারিনা। বাংলাদেশই একমাত্র আমাদের বিপদের বন্ধু।

এই আশ্রয় শিবিরে গত শুক্রবার এসেছেন আবুল হামাদ, তিনি বলেন, এদেশের মানুষ যদি আমাদেরকে খাদ্য ও বাসস্থান দিয়ে সহযোগিতা না করতো, তাহলে এতোদিনে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ইতিহাস হতো ভিন্ন ।

গত ২৪ আগস্ট মায়ানমারের সামরিক বাহিনী ব্যাপক সামরিক হামলা শুরু রাখাইন রাজ্যে। পুড়িয়ে দেয় রাখাইন মুসলিম সম্প্রদায়ের হাজার হাজার বাড়িঘর। সামরিক বাহিনী ও বৌদ্ধ উগ্রপন্থীদের নির্যাতন থেকে রক্ষা পেতে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন কমপক্ষে চার লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম। বর্তমানে তারা উখিয়ার বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন।

এদিকে, বিপুল সংখ্যক এই রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বিশ্বে নতুন এক আলোচনার সূত্রাপাত ঘটিয়েছে বাংলাদেশ। এতো বিপুল সংখ্যক মানুষকে আশ্রয় দিয়ে বিশ্বে মানবিকতার নতুন এক দিগন্ত সূচনা করলো বাংলাদেশ। একই সাথে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষও দেশান্তরিত রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তায় এগিয়ে এসেছেন। এদশের সরকার এবং জনগণ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে জীবন বাঁচিয়েছেন, খাবার দিয়ে ক্ষুধা নিবারণ করেছেন,

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য বড় উদারতা দেখিয়েছেন। এরই মধ্যে বৈশ্বিক পর্যায়ে একটি সুনামও কুড়িয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার আন্তরিকতায় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতন থেকে প্রাণ বাঁচাতে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে নিরাপদ আশ্রয়স্থল। ।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অভিযোগ, শুধু মুসলমান হওয়ার কারণে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাষ্ট্রীয়ভাবে রাখাইন রাজ্যে গণহত্যা চলাচ্ছে। তারা রোহিঙ্গা পুরুষদের হত্যা করছে, শিশুদের জবাই করছে, নারীদের ধর্ষণ করছে, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ এবং লুঠতরাজ চালাচ্ছে। ইসলাম ধর্মাবলম্বী হওয়ার অপরাধে কয়েক যুগ ধরে জাতিগত প্রতিহিংসার শিকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। সভ্যতার এ যুগে রাষ্ট্রিয় মদদে নিষ্ঠুর বর্বরতা ও নারকীয় সন্ত্রাস চলছে এ সম্প্রদায়ের লোকজনের উপর।

আপনার মতামত দিন...

ক্যালেন্ডার এবং আর্কাইভ