চট্টগ্রাম, , মঙ্গলবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

পাশ্চাত্যের গবেষণায় জিতেছে ‘আমাদের দেহঘড়ি’

প্রকাশ: ২০১৭-১১-১৪ ১৭:২৮:০২ || আপডেট: ২০১৭-১১-১৪ ১৭:২৮:০২

ফজলুর রহমান

কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন স্যারকে খুব করে চেনা। আমার শিক্ষক ছিলেন। যখন পড়তাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে। সম্পাদনা বিষয়টি পড়াতেন সুন্দর ভঙ্গিমায়, প্রমিত উচ্চারণে। অন্য আরেকটি পরিচয় আছে তার। যা কেউ কেউ জানতাম। যারা জানতনা তারাও পরে পেয়েছেন মিডিয়ায়। তিনি সময় মাপক ঘড়ি ব্যবহার করেন না। আকাশ পড়তে পারেন। আলো-অন্ধকার মেপে বলতে পারেন এখন সময় কত? বেজেছে কয়টা! ইহারেই তো কয় প্রকৃতির শিষ্যতা। ‘বিশ্ব জোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র’-এই ছত্রটির এখানেই তো সার্থকতা। প্রকৃতির সাথে একটি অন্তরঙ্গ যোগাযোগেই অব্যাহত রয়েছে মানবজাতির পথচলা। আমাদের আত্মসহ দেহের বিভন্ন অঙ্গ এভাবেই প্রকৃতির সাথে যুগল হয়ে পথ চলছে অবিরাম। আমাদের এই দেহঘড়িটাই গড়েছে প্রকৃতির তালে তালে। তার প্রমাণ পেয়ে আসছি আমরা। এখন আরো বেশি পরিণত প্রমাণের সময় সমাগত।

সর্বশেষ আমরা দেখছি এই দেহঘড়ি নিয়ে গবেষণা করে এই ২০১৭ সালের জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান যুক্তরাষ্ট্রের তিন প্রখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞানী জেফ্রি সি হল, মাইকেল রোজবাস ও মাইকেল ডাব্লিউ ইয়াং। তাঁরা দেহের আণবিক স্তরে প্রাকৃতিক বা জৈবিক ঘড়ি কিভাবে কাজ করে তা দেখিয়েছেন, যা সারকোডিয়াম রিদম নামে পরিচিত। যথাযথ উপায়ে ঘুমানো স্বাস্থ্যের জন্য কেন ও কিভাবে গুরুত্বপূর্ণ, বিজয়ীত্রয়ের গবেষণা সে বিষয়ে আরো জনসচেতনতা সৃষ্টি করবে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে।

পৃথিবীর ঘূর্ণন গতির সঙ্গে তাল মেলানোর উপযোগী করে তৈরি হয়েছে মানবদেহ। বহু বছর ধরে মানুষসহ পৃথিবীর অন্যান্য জীবের দেহে এক ধরনের জৈবিক ঘড়ির উপস্থিতির কথা সবার জানা। কিন্তু কিভাবে এই দেহঘড়ি কাজ করে তা অজানা ছিল এত দিন পর্যন্ত। তাঁরা তিনজন অনেক বছরের গবেষণায় এই জৈবিক ঘড়ির কর্মপ্রক্রিয়া প্রমাণসহ হাজির করতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, কিভাবে মানব তথা উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহাভ্যন্তরে নিয়ন্ত্রিত ‘জৈবিক ছন্দ’ ঘূর্ণমান পৃথিবীর দিন-রাতের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়।

উক্ত গবেষণা সূত্রে জানা যায়, নোবেলজয়ীরা গবেষণাগারে একটি ‘ফল মাছিকে’ নমুনা হিসেবে ব্যবহার করেন। মাছির এমন একটি জিনকে তাঁরা আলাদা করেন যেটা দেহের দৈনন্দিন জৈবিক ছন্দকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাঁরা দেখিয়েছেন, জিনটি রাতের বেলায় একটি প্রোটিনের ভেতরে ঊহপড়ফব বা সাংকেতিক সিগন্যাল স্তুপাকারে জমা করে এবং দিনের বেলায় তা অধঃপতিত বা উবমত্ধফবফ করে। পরে তাঁরা আরো একটি প্রোটিন উপাদান চিহ্নিত করেন, যেটি কোষের ভেতরের ওই জৈবিক ঘড়ির প্রক্রিয়াটিকে স্বয়ংক্রিয় মেশিন হিসেবে সচল রেখেছে।

তাঁদের এই মহান আবিষ্কারের কল্যাণে এখন এটা স্পষ্ট, বহুকোষীয় জীব বিশেষ করে মানুষের শরীরে একটি দেহঘড়ি বিদ্যমান। যা আমাদের আচরণ, হরমোনের মাত্রা, ঘুম, শরীরের তাপমাত্রা ও বিপাকের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যকলাপকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাঁরা স্থির হয়েছেন-মানবজাতির জন্য এমন একটি দেহঘড়ি প্রয়োজন, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানুষকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় চালিত করবে; যেমন, ঘুম, হরমোনের স্তর, শরীরের তাপমাত্রা, বিপাক ইত্যাদি।

নোবেল কমিটি বলছে, ‘পৃথিবীর আহ্নিক গতির সঙ্গে জীবজগতের এক অবিচ্ছেদ্য সম্বন্ধ রয়েছে। এমন ধারণা বহু প্রাচীন হলেও তার কোনো প্রমাণ মিলছিল না। আর এ প্রমাণটিই সবার সামনে হাজির করে নোবেল জিতে নিয়েছেন মার্কিন তিন বিজ্ঞানী।’

এ তিন মার্কিন জিনবিজ্ঞানীও বলছেন, দেহের অভ্যন্তরে একটি ঘড়ি রয়েছে, যা বহির্জগতের সঙ্গে জীবজগতের মেলবন্ধনটি তৈরি করে। এ ঘড়িই নির্মাণ করে ঘুম ও জাগরণের এক অনিঃশেষ চক্র, যার ওলটপালটে বদলে যেতে পারে অনেক কিছু। এ অনেক কিছুর তালিকাটিও আবার ছোট নয়। এর মধ্যে রয়েছে বিপাক ক্রিয়া, হৃৎক্রিয়া, মন ও মস্তিষ্কের স্বাভাবিকতা। এর একটু ওলটপালটেই বদলে যেতে পারে সংশ্লিষ্ট প্রাণীর আচরণ। তারা বলছেন, সপ্রাণ জীব মাত্রই দেহঘড়ির বাহক।

এই আউল-বাউল-লালনের দেশে অবশ্য এই ‘দেহঘড়ি’ কিংবা ‘দেহতত্ত্ব’ এর সমৃদ্ধ ইতিহাস আছে। ফকির লালন শাহ থেকে বয়াতি আবদুর রহমান অবধি ‘দেহ’ নিয়ে অনেক বিচরণ ও চরণ পেয়েছি আমরা। তাঁরা যুগ যুগ ধরেই দেহ ও জগৎকে এক করে দেখেছেন। এখানে দেহঘড়ির কালচার অনেক পুরোনো। মাটি-মানুষে একাকার নানাভাবে।

দেহতত্বই আমাদের বাউল সম্প্রদায়ের মূলভিত্তি হয়ে আছে। দেহই যেন সকল রহস্যের মূল। দেহকে দেখার অর্থ দেহকে পাঠ করা। বা আতœদর্শন করা। অন্যভাবে বলা যায় ‘নিজেকে জানো’ এর ছবক নেয়া। নিজের সত্তার সন্ধানের মাধ্যমে পরম সত্তার অস্তিত্ব জানা যায়। আমাদের দেহের মাঝে যত কার্য হচ্ছে তার মধ্যে শ্বাস-প্রশ্বাসই প্রধান কার্য। আধ্যাত্মিক সাধনায় এর গুরুত্ব বলে শেষ করা সম্ভব নয়। দেহের সব খবর এই শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমেই একজন সাধক জানতে পারে। তাই লালন সাঁইজি বলেছেন “ধর চোর হাওয়ার ঘরে ফাঁদ পেতে”। শ্বাস-প্রশ্বাসের খবর জানতে পারলেই দেহের মধ্যে সংঘটিত সকল কাজের আগাম সংবাদ পাওয়া যায়, এমন কি মৃতে্যুর সংবাদ পর্যন্ত বলে দেওয়া যায় মৃতে্যু হওয়ার অনেক পূর্বেই।

তাই ‘মন আমার দেহঘড়ি সন্ধান করি, কোন মিস্তিরি বানাইয়াছে?’ এমন কথা অনেক তুলেছি গানে গানে। ‘যা নেই ভান্ডে, তা নেই ব্রহ্মান্ডে’ এ আপ্তবাক্যকে ধারণ করেছি জীবনে মনে।
আবদুর রহমান বয়াতি গানে যেমন বলছেন, ‘একখান চাবি মাইরা দিছে ছাইড়া, জনম ধইরা চলতে আছে। মাটির একটা কেস বানাইয়া মেশিন দিছে তার ভিতর।’ আর মেশিনের পরিচয় হিসেবে একটি বিশেষ জিনের কথা জানান দিয়েই পুরস্কার জিতেছেন উক্ত তিন জীববিজ্ঞানী। বাংলাদেশের বাউল কথা বলেছেন বাউলের ঢংয়ে। সন্ধান করেছেন নিজস্ব পথে। প্রশ্ন রেখেছেন। আবার ‘প্রেম নয়নে’ খোঁজার কথা বলে উত্তর সন্ধানেরও পথ বাতলে দিয়েছেন তিনি। জেফরি সি হল, মাইকেল রোজব্যাশ ও মাইকেল ডব্লিউ ইয়ং এ প্রেম নয়নেই অনুসন্ধান করেছেন নিশ্চিত, যার আরেক নাম বিজ্ঞান।

এবার আমাদের অঞ্চলের এ রকম অনেক গান আর লোককথার ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে আসি একটু। বাউল স¤্রাট লালন শাহের আরেকটি গানকে আমলে এনে বিচার করি। এরপর শব্দার্থ বুঝে আরেকটি পরিষ্কার ধারণা নিয়ে নিব।

আমাদের লালন গাহেন-
‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়। তারে ধরতে পারলে মনো বেড়ি দিতাম পাখির পায়/ আট কুঠুরী নয় দরজা আটা মধ্যে মধ্যে ঝরকা কাটা/ তার উপরে সদর কোঠা আয়না মহল তায় /কপালের ফে’র নয়লে কি আর পাখিটির এমন ব্যবহার/খাঁচা ছেড়ে পাখি আমার কোন খানে পলায়/মন তুই রইলি খাঁচার আশে খাঁচা যে তোর কাঁচা বাঁশে/কোন দিন খাঁচা পড়বে খ’সে/ লালন ফকির কয়।’

ভাব অনুসরণে শব্দার্থ :- খাঁচার ভিতর = দেহ অবকাঠামোর অভ্যন্তর। অচিন পাখি = আত্মারূপী কর্তা, যিনি দমের সনে দেহে আসা যাওয়া করেন । মন বেড়ী = মনরূপ বেড়ী বা শৃঙ্খল । আটকুঠুরী = মুখ, মস্তক, কপোল, গ্রীবা, বাম স্তনের নিচে নাভী, মেরুদন্ড ও মূলাধার। নয় দরজা = চক্ষু, কর্ণ নাসিকা (ছয় দ্বার) এবং মুখ, উপস্থ, গুহ্য (তিন দ্বার)। ঝরকাটা কালবের রন্ধ্রসমূহ : সদর কোঠা = মস্তিষ্ক। আয়না মহল = জ্ঞান পদ্ম বা আজ্ঞাচক্র, যেখানে রূপ প্রতিভাত হয়। ফে’র = দুর্ভোগ । খাঁচার আশে = দেহের উপর নির্ভরতা। কাঁচা বাঁশে = নশ্বর বস্তুতে সৃষ্ট । পড়বে খ’সে = মৃতে্যুর মধ্য দিয়ে যার পরিসমাপ্তি ঘটবে ।

স্রষ্টার সমগ্র সৃষ্টবস্তুর মধ্যে অন্যতম ও সার্থক সৃষ্টি হল মানব দেহ অবকাঠামো। ফকিরগণের সাধন-ভজনের ক্ষেত্রে বা কেন্দ্রও হচ্ছে এই মানব দেহ। পিঞ্জিরা স্বরূপ দেহভান্ডে সদা জাগ্রত আত্মা রূপী কর্তা অর্থাৎ সাঁই সর্বদা হওয়ার রূপ ধরে দমের মাধ্যমে দেহাভ্যন্তরে আসা যাওয়া করেন। সেই জন্যই মানবাত্মা দেহ নির্ভর, অর্থাৎ দেহকে ঘিরে আবর্তিত হতে থাকে।

আমরা লালনের সুরে অনেক আগেই বলেছিলাম-‘বাড়ির পাশে আরশিনগর, সেথা পড়শী বসত করে।’ এখানে রূপক অর্থে দেহ-আতœার কথা বলা হয়েছে। এতদিন গেয়েছিলাম আমরা-‘আমি একদিনও না দেখিলাম তারে।’ এখন আধুনিক যুগে এসে এসব দেখারও সুযোগ হয়েছে। পড়শীর সাথে এখন নতুন করে বোঝাপড়া শুরু হতে পারে আমাদের। এই প্রাচ্যে ভাবের তালে তার ইঙ্গিত দিয়েছেল অনেক আগে। এখন দূর পাশ্চাত্যের গবেষণা দিচ্ছে তার নিশ্চয়তা। বিশেষ করে, দেহঘড়ি বিষয়ে পাশ্চাত্য যতই গভীরে যাচ্ছে, ততই জিতে যাচ্ছে এই প্রাচ্য!

লেখক:  সহকারী রেজিস্ট্রার (সমন্বয়), ভাইস চ্যান্সেলর অফিস, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। সিটিজি টাইমস -এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই সময়ের কথা বিভাগে প্রকাশিত লেখার জন্য সিটিজি টাইমস কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

আপনার মতামত দিন...

ক্যালেন্ডার এবং আর্কাইভ