চট্টগ্রাম, , বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

অস্ত্রের ভয়ে পাহাড়ের আওয়ামীলীগে পদত্যাগের হিড়িক

প্রকাশ: ২০১৭-১২-০৯ ১৬:৫৯:২৫ || আপডেট: ২০১৭-১২-১০ ১১:০৯:৫৩

আলমগীর মানিক
রাঙামাটি থেকে

চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতি থেকে পাহাড়ের জনসাধারণকে স্থায়ীভাবে শান্তি উপহার দেওয়ার জন্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র সংগঠনের সাথে চুক্তি করে শান্তি প্রক্রিয়া শুরু করার একমাত্র কারিগর ছিলো বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ। দলটির রাঙামাটির সভাপতি সাবেক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী দিপংকর তালুকদার ছিলেন এই চুক্তি সম্পাদনের অন্যতম রূপকার। কালের পরিক্রমায় সেই আওয়ামীলীগই বর্তমান সময়ে পাহাড়ে অনেকটা কোনঠাশা অবস্থায় পড়েছে। যাদের সাথে চুক্তি সম্পাদন করে গেরিলা জীবন থেকে স্যুটটাই পড়া জীবনাবস্থায় নিয়ে এসেছিলো সেই বন্ধুরাই চরম শত্রুতে পরিণত হয়েছে বর্তমান সময়ে। শত্রুদের চরম আক্রমনে পাহাড়ের দূর্গম এলাকার উপজাতীয় সম্প্রদায়ের আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা গুম-খুনের পাশাপাশি প্রাণ নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে প্রতিনিয়ত। সার্বক্ষনিক আতঙ্কের মধ্যে বাস করা দূর্গম অঞ্চলের আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা ইতোমধ্যেই গণহারে পদত্যাগ করছে।
ব্যক্তিগত..অসুস্থতাজনিতসহ পারিবারিক কারন দেখিয়ে দলের জেলা কমিটির কাছে পাঠাচ্ছে পদত্যাগপত্র। সম্প্রতি জুড়াছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অরবিন্দু চাকমার হত্যার তিন দিনের মাথায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ১২ জন নেতা পদত্যাগ করেছেন। শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টায় উপজেলা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে তারা এ তথ্য জানান। পদত্যাগ করা নেতারা হলেন : উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি কালাধন চাকমা, যুগ্ম সম্পাদক পব্বন বিকাশ চাকমা, সহ-সভাপতি অনিল কুমার চাকমা, মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সম্পাদক দীপংকর কার্ব্বারী, যুবলীগের অর্থ সম্পাদক উত্তম কুমার চাকমা, মহিলালীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক টুনি চাকমা, জুরাছড়ি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি হৃদয় রঞ্জন চাকমা, কৃষকলীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক সনদ কুমার চাকমা, কার্যকরী কমিটির সদস্য ফুলেশ্বর চাকমা, ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক রপ্তদীপ চাকমা (রকি)সহ নব্য যোগদানকারী সাবেক দুমদুম্যা ইউপি চেয়ারম্যান রাজিয়া চাকমা ও বনযোগীছড়া ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত ওয়ার্ড সদস্য কৃষ্ণা চাকমা।

এ পদত্যাগের ব্যাপারে তারা বলেন, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সমস্যার কারণে দলীয় সকল কার্যক্রম থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি নিচ্ছেন। ইতোমধ্যে দলের নিয়মানুসারে পদত্যাগপত্র সভাপতির কাছে পাঠানো হয়েছে। তবে এ পদত্যাগের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর উপজেলার প্রথম সারির নেতারা বলেছেন, পদত্যাগ বিষয়ের তাদের জানা নেই। পদত্যাগের কোন কাগজপত্রও তারা পাননি। কাগজপত্র পেলে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজি মো.মুছা মাতব্বর অবশ্য পদত্যাগের বিষয়টি জেনেছেন উল্লেখ করে জানান, অস্ত্রের মুখে আমাদের নেতাকর্মীদের প্রাণে মেরে ফেরার হুমকি দিয়ে পদত্যাগ পত্রে জোর করে স্বাক্ষর করাচ্ছে জেএসএস এর সন্ত্রাসীরা। এই বিষয়ে দলীয় অবস্থান ব্যাখ্যা করা হবে শীঘ্রই।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, সাধারণ সদস্যসহ আরো অন্তত অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী পদত্যাগ করতে যাচ্ছে। শীঘ্রই তারা পদত্যাগপত্র দলীয় হাই কমান্ডের কাছে পাঠাবেন।

উল্লেখ্য পার্বত্য চুক্তির বর্ষপূর্তি পালন অনুষ্ঠানে আওয়ামীলীগের কঠোর সমালোচনা করে অবিলম্বে চুক্তি বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে অন্যথায় পাহাড়ে আগুন জ্বলবে বলে হুমকি দিয়েছে চুক্তি সম্পাদনকারি পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতৃবৃন্দ। এর মাত্র তিনদিনের মাথায় গত ৫ ডিসেম্বর সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গুলিতে নির্মমভাবে নিহত হন, জুরাছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অরবিন্দু চাকমা। সেদিন সন্ধ্যায় তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ হত্যার ঘটনায় জুরাছড়ি থানার পুলিশের উপ-পরিদর্শক মো. মাইন উদ্দিন বাদী হয়ে নয়জনের নাম উল্লেখসহ ও অজ্ঞাত ১৫-২০ জন আসামী করে বৃহস্পতিবার মামলা করেন। অপরদিকে একই দিন বিলাইছড়িতেও ধারালো অস্ত্রদিয়ে উপজেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি রাসেল চাকমাকে হত্যার চেষ্ঠা করে আঞ্চলিকদলীয় সন্ত্রাসীরা। এদিকে উপরোক্ত দুইটি ঘটনার প্রতিবাদে রাঙামাটি শহরে বিক্ষোভ মিছিল বের জেলা আওয়ামীলীগসহ অঙ্গসহযোগি সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এই কর্মসূচীতে অংশ নিয়ে অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে বক্তব্য রেখেছিলেন জেলা মহিলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি ঝর্না খীসা। দিনশেষে বিকেল বেলায় দলীয় কর্মসূচী শেষে নিজ বসতঘরে স্বামী-সন্তান নিয়ে ঘুমন্ত অবস্থায় আঞ্চলিকদলীয় সন্ত্রাসীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে রক্তাক্ত করে অর্ধমৃত অবস্থায় ফেলে রেখে যায় ঝর্ণা ও তা পরিবারের সদস্যদের।

একের এক হত্যা-হামলাসহ অব্যাহত হুমকির মুখে পাহাড়ের রাজনীতিতে আওয়ামীলীগের অবস্থান ধীরে ধীরে মলিনতার দিকে ধাবিত হচ্ছে। আঞ্চলিক দলীয় সন্ত্রাসীদের অব্যাহত হুমকির মুখে নিজ নিজ বাড়ি-ঘর ফেলে রেখে প্রাণ নিয়ে শহরে কিংবা আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে আত্মগোপন করে থাকছে রাঙামাটির বিভিন্ন উপজেলার ইউনিয়ন পর্যায়ের উপজাতীয় নেতাকর্মীরা।

আপনার মতামত দিন...

ক্যালেন্ডার এবং আর্কাইভ