চট্টগ্রাম, , বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

রাউজানে দুই দিনে ২ গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু, ৪ শিশুর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ!

প্রকাশ: ২০১৭-১২-২৪ ১১:০৩:৫৪ || আপডেট: ২০১৭-১২-২৪ ১৩:১১:৪৩

মো. হাবিবুর রহমান
রাউজান প্রতিনিধি

কিছু মৃত্যু শুধু স্বজনদের কাঁদিয়ে ক্ষ্যান্ত থাকেনা। কাঁদায় ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আর বিবেকবান মানুষদের। শোকাহত করে রক্তের সম্পর্ক নেই এমন লোকজনকেও। এমনি রাউজানের পৃথক দুই গৃহবধুর রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় কাঁদিয়েছে অনেককে। পৃথক দুটি ঘটনায় নিহত দুই গৃহবধূর রয়েছে অবুঝ শিশু। রাউজানের সুলতানা আকতার বেবী ও দুবাই প্রবাসী রুবেল দম্পতির দুই ফুটফুটে সন্তান। ৩ বছর বয়সের বড় মেয়ে নিহা, ১ বছর ৩ মাস বয়সের পুত্র রোহান । এখন ওদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ! জেদী মায়ের জন্য এ দুই শিশুকে অল্প বয়সে হতে হয়েছে মা হারা সন্তান।

কিন্তু কেন? দুবাই প্রবাসী রুবেলের সুখের সংসার। গত ৩/৪ বছর আগে বাগোয়ান ইউনিয়নের কোয়েপাড়া গ্রামের আনোয়ার চৌধুরীর কন্যা ও পূর্বগুজরা ইউনিয়নের বড় ঠাকুর পাড়ার চতর পাড়া গ্রামের আবু হানিফের দুবাই প্রবাসী পুত্র রুবেলের পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। প্রবাসে হাড় ভাঙা পরিশ্রম করে স্ত্রী-সন্তান, বাবা-মাকে রেখেছেন ফ্ল্যাট বাসায়। মা ও দাদা-দাদির আদরে যত্নে বেড়ে উঠতেই হঠাৎ ঘটে গেলে এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা।

বৃহস্পতিবার (২১ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় নিহাকে শাসন করতে গিয়ে তেলের গ্ল্যান দিয়ে আঘাত করে রুবেলের স্ত্রী সুলতানা আকতার বেবী। নাতনির উপর পুত্রবধূর নির্মমতা সহ্য করতে না পেরে পুত্রবধূকে গালমন্দ করে শ্বশুর-শ্বাশুরী দুজনই। সতর্ক করে দিয়েছিল যাতে এভাবে আঘাত না করে। এর জের ধরে ক্ষোভে অভিমানে দুদিন অনাহারে ছিল সুলতানা আকতার। ফ্ল্যাট বাসায় আত্মহত্যার চেষ্টা করলে শ্বশুর, শ্বাশুরী রক্ষা করে।

পরে গত শুক্রবার (২২ ডিসেম্বর) রাত ৯টার দিকে বেবী ও তার মা-বাবার ইচ্ছেয় টেক্সী করে তার বাপের বাড়িতে নিয়ে যায় শ্বশুর ও ননদের স্বামী। টেক্সী থেকে নেমে রুমে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে দেয় সুলতানা আকতার বেবী। যখন বেবীর মা বিয়ায় ও তার সঙ্গে যাওয়া আত্মীয়দের আপ্যায়ণে ব্যস্ত। ঠিক তখনি বেবী সিলিং ফ্যানের সাথে শাড়ি দিয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করে। তুচ্ছ ঘটনায় আত্মহত্যা করে বেবী তার দুসন্তানকে রেখে গেছেন অনিশ্চিত ভবিষ্যতে। ওরা হয়তো দাদা-দাদির আদরে বড় হবে কিন্তু মায়ের শূণ্যতা কি কখনো পূর্ণতা পাবে?

অপরদিকে আরেক ঘটনায় রিংকি দাশ নামের এক গৃহবধুকে হত্যার অভিযোগ উঠে। সে উপজেলার গুজরা ইউনিয়নের মগদাইর গ্রামের শ্যামাচরণ মহজান বাড়ির সঞ্জয় দাশের স্ত্রী ও বায়েজিদ আবাসিক এলাকার রতন দাশের কন্যা। সঞ্জয় ও রিংকি দম্পতিরও রয়েছে দুই ফুটফুটে সন্তান। তিন বছর বয়সের কন্যা পুষ্পিতা দাশ ও এক বছর বয়সের পুত্র উত্তম দাশ। গত বৃহস্পতিবার (২১ ডিসেম্বর) রাতে রিংকি দাশের রহস্যজনক মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুতে দুই সন্তান এখন মা হারা। রিংকির মায়ের মৃত্যুর খবরে বাড়িতে অনেক মানুষের উপস্থিতিতে তার ১ বছরের পুত্র উত্তম দাশ সবার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে দেখছে। যে কোলে নিতে চায় তার কোলেই সে যাচ্ছে। কিন্তু মায়ের মুখ দেখছে না।

আর কোনদিন সে মায়ের মুখ দেখবে না। কিছুক্ষণ পর পর কান্না করছে আর এদিক ওদিক কি যেন খুঁজছে। উপস্থিত সকলেই বুঝতে পারল ১বছর বয়সের উত্তম দাশ তার মাকে খুঁজছে। এ দৃশ্য দেখে বাড়ির আঙ্গিনায় উপস্থিত সবার চোখের জল গড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। রাউজান উপজেলার পৃথক দুটি ঘটনায় ৪ শিশুর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। চার শিশুর মধ্যে কেউই বুঝতে পারছেনা ওদের মা আর নেই। অবুঝ শিশুগুলোর ভবিষ্যৎ কি? মায়ের আদর-স্নেহ, মায়া-মমতা থেকে বঞ্চিত এসব শিশুকি স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠবে? নাকি অন্ধকার গলির ভেতরে হারিয়ে যাবে ওদের স্বাভাবিক জীবন! সচেতন মহলের প্রত্যাশা অবুঝ শিশু রেখে যাতে কোন মায়ের মৃত্যু না হয়। আত্মহত্যা কিংবা কাউকে হত্যা করেই কি সব সমাধান? কখনো না! তাই আত্মহত্যা কিংবা কাউকে হত্যার পথ বেচে না নিয়ে সমঝোতাটাই প্রয়োজন। অন্তত অবুঝ শিশুগুলোর দিকে তাকিয়ে কি ক্ষোভ, রাগ-অভিমান কমানো যায়না।

একবার ভাবুনতো অন্যশিশু যখন মাতৃ-স্নেহ লালন পালন হবে তখন আপনার অনুপস্থিতিতে অপনার অবুঝ শিশুগুলোর ভবিষ্যৎ কি? নিঃসন্দেহে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ! ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অন্ধকার ভবিষ্যতে ঠেলে না দেয়ার জন্য সচেতনতা বৃদ্ধিতে আমাদের কি কোন করণীয় নেই?

আপনার মতামত দিন...

ক্যালেন্ডার এবং আর্কাইভ