চট্টগ্রাম, , সোমবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

সালতামামি ২০১৭- চট্টগ্রামের রাজনীতি : নেতা হারানোর বছর!

প্রকাশ: ২০১৭-১২-২৯ ২৩:৫০:০১ || আপডেট: ২০১৭-১২-৩০ ০৮:৪৯:০১

দু’দিন পরই বিদায় নিচ্ছে আরেকটি বছর, ২০১৭। শুরু হয়েছে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব-নিকাশ। এই হিসাব-নিকাশের আয়নায় পেছন ফেরে দেখা হচ্ছে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনেও। কেমন ছিল চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে ২০১৭?

২০১৭ সাল। বছরটা যেন চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক বিশাল শূন্যতার বছর। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের জন্য।

এ বছরই মহানগর আওয়ামী লীগের দুই বলিষ্ঠ কাণ্ডারী বিদায় নেন পৃথিবী থেকে।

একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ, সাবেক গণপরিষদ সদস্য, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর ইছহাক মিঞা। আর একজন সদ্যপ্রয়াত নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি, তিনবারের সফল মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী।

জুলাই মাসের ২৪ তারিখ সোমবার বার্ধক্যজনিত কারণে ৮৮ বছর বয়সে নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন চট্টলার আওয়ামী রাজনীতির অন্যতম অভিভাবক ইছহাক মিঞা।

তিনি ১৯৭০-এর নির্বাচনে জয়ী হয়ে গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ছিলেন চট্টগ্রামের নির্বাচিত পৌর কাউন্সিলর, এমএনএ এবং এমপি। চট্টগ্রাম বন্দরের প্রশাসক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ত্যাগী ও পরীক্ষিত এই নেতা নিজ দলের নবীন-প্রবীণ সবার কাছে ছিলেন সমান জনপ্রিয়। ৫২-এর ভাষা আন্দোলনের এই কর্মী ৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৫৮-এর সামরিক সরকারবিরোধী আন্দোলন, ৬২-এর সম্মিলিত বিরোধী দলের আন্দোলন, ৬৮-৬৯-এর গণআন্দোলন, ৭০-এর নির্বাচন, ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, ৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ, ৭৯ ও ৮৬-এর নির্বাচন, ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ৯৬ ও ২০০১-এর নির্বাচন এবং ২০০৭-এ ওয়ান ইলেভেনের সময় শেখ হাসিনার পক্ষে জনমত সৃষ্টি ও কারামুক্তির আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন এই নেতা। রাজনীতি করতে গিয়ে কারাভোগ করেছেন বারবার। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য।

তবে নগর আওয়ামী লীগের জন্য সবচেয়ে শোকের দিন বিজয়ের মাস ডিসেম্বরের ১৫ তারিখ। ওই রাতে চট্টগ্রাম হারায় তার সত্যিকারের এক অভিভাবককে। লাখো নেতাকর্মীকে চোখের জলে ভাসিয়ে দীর্ঘদিন রোগভোগের পর চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় না ফেরার দেশে চলে যান চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনের অন্যতম বলিষ্ঠ নেতা চট্টলবীর খ্যাত এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। দীর্ঘদিন ধরেই কিডনিজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি।

মহিউদ্দিন চৌধুরী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন ছাত্রাবস্থায়। ১৯৬৮ ও ৬৯ সালে চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করা মহিউদ্দিন চৌধুরী একাত্তরে গঠন করেন ‘জয় বাংলা’ বাহিনী। এরপর গ্রেফতার হন পাকসেনাদের হাতে। তবে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে পাগলের অভিনয় করে কারাগার থেকে পালিয়ে ভারতে চলে যান তিনি। এরপর সেখানের উত্তর প্রদেশের তান্ডুয়া সামরিক ক্যাম্পে প্রশিক্ষণরত মুক্তিযোদ্ধাদের একটি স্কোয়াডের কমান্ডার নিযুক্ত হন।

সম্মুখ সমরের যোদ্ধা মহিউদ্দীন স্বাধীনতার পর শ্রমিক রাজনীতিতে যুক্ত হন। যুবলীগের নগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক পদে ছিলেন তিনি।

পঁচাত্তরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বপরিবারে নিহত হওয়ার পর প্রতিশোধ নিতে মৌলভী সৈয়দের নেতৃত্বে মহিউদ্দীন গঠন করেন ‘মুজিব বাহিনী’। সে সময় ‘চট্টগ্রাম ষড়যন্ত্র মামলা’র আসামি করা হলে তিনি পালিয়ে কলকাতায় চলে যান।

এরপর ১৯৭৮ সালে দেশে ফেরেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মহিউদ্দীন চট্টগ্রামে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও শ্রমিক লীগের শীর্ষ পদে ছিলেন। চট্টগ্রামে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, বন্দর রক্ষা আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনেও তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন।

পাঁচ দশকের রাজনৈতিক জীবনে অনেক নানা অর্জন থাকলেও কখনও সংসদ সদস্য হতে পারেননি মহিউদ্দীন। ১৯৮৬ সালে রাউজান থেকে এবং ১৯৯১ সালে নগরীর কোতোয়ালী আসন থেকে নির্বাচন করে পরাজিত হন তিনি। তবে ১৯৯৪ সালে প্রথমবার চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে প্রার্থী হয়েই মহিউদ্দীন বিজয়ী হন। ২০০০ সালে দ্বিতীয় দফা এবং ২০০৫ সালে তৃতীয় দফায় মেয়র নির্বাচিত হন তিনি।

তার মেয়াদে পরিচ্ছন্নতা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ‘অনন্য দৃষ্টান্ত’ স্থাপন করেছিল বলে অনেকে মনে করেন। বন্দর নগরীর ষোলশহর এলাকায় তার বাসার গলিটি চট্টগ্রামবাসীর কাছে ‘মেয়র গলি’ হিসেবেই পরিচিত। প্রায় দুই যুগ সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করার পর ২০০৬ সালের ২৭ জুন নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি হন মহিউদ্দিন। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি নগর আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন।

এছাড়া গেল ১৭ ডিসেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন মহানগর বিএনপির সহ-সভাপতি ও সাবেক ছাত্রদলনেতা মোহাম্মদ আলী। দলের দূর্যোগ মুহূর্তে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন নগর বিএনপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নেতা। মাত্র ৪৮ বছর বয়সেই মোহাম্মদ আলীর অকাল মৃত্যু আসন্ন নির্বাচনের আগে দলের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি বলে মনে করছেন দলের সিনিয়র নেতারা।

এতো গেলো প্রবীণদের কথা। ছাত্ররাজনীতি করতে গিয়ে এবছর প্রতিহিংসার বলি হয়েছেন অনেক তরুণ ছাত্রনেতা।

২৯ মার্চ রাতে নগরীর চন্দনপুরার নিজ বাসা থেকে পুলিশ পরিচয়ে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক নুরুল আলম নুরুকে। তার পরদিন রাউজান উপজেলার বাগোয়ান ইউনিয়নের খেলারঘাট এলাকায় কর্ণফূলী নদী থেকে হাত-পা বাধা অবস্থায় লাশ পাওয়া যায় তার। পরে তার পরিবার আদালতে মামলা দায়ের করে। বর্তমানে মামলাটি পিবিআইতে তদন্তাধীন।

গেলো ৬ অক্টোবর নগরীর সদরঘাটা থানার দক্ষিণ নালাপাড়ার নিজ বাসার সামনে খুন হন মহানগর ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক সুদীপ্ত বিশ্বাস। নিজ বাসা থেকে ডেকে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয় তাকে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জেরেই মূলত প্রাণ দিতে হলো সুদীপ্তকে। এমনটাই মনে করছেন তার অনুসারীরা। হত্যার ঘটনায় চারজনকে গ্রেফতার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নেয় পুলিশ। তাদের দেয়া তথ্যমতে এই হত্যাকাণ্ডে অন্তত ত্রিশ জন জড়িত ছিলো। কিন্তু ঘটনার দুইমাস পার হলেও জবানবন্দিতে দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে এখনো কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

সবশেষ গেলো ৩ ডিসেম্বর নগরীর কদমতলীর শুভপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় নিজ দোকানের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় যুবদল নেতা মোহাম্মদ হারুনকে। তিনি সদরঘাট থানা যুবদলের আহ্বায়ক ও পরিবহন ব্যবসায়ী। ঘটনায় এখন পর্যন্ত একজনকে গ্রেফতার করা হলেও হত্যার মূল কারণ এখনো রহস্যাবৃত রয়েই গেছে।

বলা যায়, ২০১৭ সাল ছিলো চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে নেতা হারানোর বছর।

আপনার মতামত দিন...

ক্যালেন্ডার এবং আর্কাইভ