চট্টগ্রাম, , বুধবার, ১৭ জানুয়ারী ২০১৮

শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত মিরসরাইয়ের ত্রিপুরা পাড়ার অধিকাংশ শিশু কিশোররা

প্রকাশ: ২০১৮-০১-০৮ ০৯:৫৪:২১ || আপডেট: ২০১৮-০১-০৮ ১২:৪৬:০৫

এম মাঈন উদ্দিন
মিরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি

মিরসরাইয়ের ত্রিপুরা জনগোষ্ঠি অধ্যুষিত একটি পাড়ায় সহ¯্রাধিক মানুষের বসবাস থাকলেও সাড়ে চার কিলোমিটারের মধ্যে নেই কোন প্রাথমিক বিদ্যালয়। তাই বাধ্য হয়ে সন্তানদের লেখাপড়া শেখাতে আগ্রহী কিছু সংখ্যক অভিভাবক তাদের শিশুদের পাঠায় ৫ কিলোমিটার দুরে অবস্থিত অলিনগর বি এম কে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। কিন্তু কোমলমতি এই স্কুলগামী শিশুদের প্রতিদিন ২ কিলোমিটার সংকির্ণ উচুঁ নিচু পাহাড়ি রাস্তায় হেটে এবং বাকিপথ বাস অথবা সিএনজি অটোরিক্সায় চড়ে সময়মতো স্কুলে পৌছানো দুঃসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

জানা গেছে, বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে উপজেলার করেরহাট ইউনিয়নের নলখোঁ ত্রিপুরা পাড়ার বিদ্যালয় গমন উপযোগী শিশু কিশোররা। তাছাড়া প্রতিদিন তাদের দরিদ্র্য অভিভাবকদের পক্ষে গাড়ি ভাড়া বাবদ ৩০-৪০ টাকা দেয়া সম্ভব হয়না বলে তারা সপ্তাহে স্কুলে যায় বড়জোর দুই থেকে তিন দিন। এছাড়া বর্ষা মৌসুমে এসব শিশুদের স্কুলে যাওয়া প্রায় বন্ধই হয়ে যায়। এক পর্যায়ে এই ত্রিপুরা পাড়ার স্কুলগামী শিশুরা দুর্গম পথে যাতায়াত, দুরত্ব ও চরম দারিদ্র্যতার কারনে শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকেই ঝরে পড়ছে। মৌলিক এই অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে তাঁরা স্কুলে যাওয়ার বয়সেই এখন নিয়োজিত হচ্ছে তাদের পূর্বপুরুষের আদিম পেশায়।

সরেজমিনে নলখোঁ ত্রিপুরা পাড়ায় গিয়ে অনুসন্ধান করে জানা যায়, এই পাড়ায় সাতটি ছোট বড় পাহাড়ের উপর ১০০টি ত্রিপুরা পরিবারের মধ্যে সহ¯্রাধিক মানুষের বসবাস। তার মধ্যে ১০ টি পরিবার খ্রীষ্টান ধর্ম পালন করে এবং বাকিরা সনাতন ধর্মালম্বী। বর্তমানে এই পাড়ায় স্কুল গমন উপযোগী শিশু কিশোর আছে এমন পরিবারের সংখ্যা ৫৬ টি। এই পরিবারগুলোর মধ্যে ৫ থেকে ১২ বছর বয়সি শিশু কিশোরের সংখ্যা ১১৪ জন। তাদের মধ্যে ৭৩ জন ছেলে এবং ৪১ জন মেয়ে। এই শিশু কিশোরদের মধ্যে বর্তমানে স্কুলমুখী ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ৫১ জন। এছাড়া এই পাড়ায় যাতায়াত ব্যবস্থা, পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ পানির অভাব, জন্ম নিয়ন্ত্রন পদ্ধতি সর্ম্পকে ধারনার অভাব সহ নানাবিধ সমস্যা বিদ্যমান।

নলখোঁ ত্রিপুরা পাড়ার অধিবাসী রবার্ট রতট ত্রিপুরা ও পাড়া প্রধান সাধন ত্রিপুরা বলেন, নলখোঁ ত্রিপুরা পাড়ার জনগোষ্ঠিদের অধিকাংশই নিরক্ষর হওয়াতে বর্তমান সমাজে তাদের পদে পদে নানারকম বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার হতে হয়। তাই আমরা চাই আমাদের সন্তানরা সুশিক্ষায় শিক্ষিত হোক। কষ্ট করে হলেও আমরা সন্তানদের লেখাপড়া শেখাতে চাই। কিন্তু এখানে কোন স্কুল না থাকাতে আমাদের সন্তানরা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমাদের এই পাড়ায় প্রায় ২০০ জন ভোটার রয়েছে। স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনের সময় জনপ্রতিনিধিরা এখানে এসে নানারকম প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে আর তাদের দেখা মিলেনা। আমরা চাই আমাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে, তাই এখানে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হোক। স্কুলের জন্য জমি দেয়ার জন্য আমরা প্রস্তুত।

নলখোঁ ত্রিপুরা পাড়ার শিশু কিশোরদের শিক্ষার এমন বেহাল অবস্থার কথা স্বীকার করে করেরহাট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এনায়েত হোসেন নয়ন বলেন, নলখোঁ ত্রিপুরা পাড়ায় এনজিও পরিচালিত একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিলো, বর্তমানে স্কুলটির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ওই এলাকায় যে কোন ভাবে একটি প্রাথমিক স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য আমি জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

এই ব্যাপারে মিরসরাই উপজেলা শিক্ষা অফিসার গোলাম রহমান চৌধুরী বলেন, ওই এলাকায় কোন বিত্তবান শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিগত উদ্যোগে যদি স্কুলের কার্যক্রম শুরু করে তাহলে আমি এর প্রশাসনিক বিষয়টি দেখবো এবং প্রয়োজনীয় সহযোগীতা করবো। হটাৎ করে ওই এলাকায় সরকারী উদ্যোগে কোন স্কুল প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।

এই বিষয়ে মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুল কবির জানান, বর্তমান সরকার প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। মিরসরাই উপজেলার দুর্গম এই পাহাড়ি এলাকার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির শিশু কিশোরদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টি আমি এর আগে জ্ঞাত ছিলাম না। খুব দ্রুত আমি ওই এলাকা পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করবো।

আপনার মতামত দিন....

ক্যালেন্ডার এবং আর্কাইভ

FriSatSunMonTueWedThu
   1234
19202122232425
262728293031 
       
    123
45678910
11121314151617