চট্টগ্রাম, , বুধবার, ১৭ জানুয়ারী ২০১৮

শুকিয়ে যাচ্ছে খাল ও নদী চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকায় সেচ সংকট

প্রকাশ: ২০১৮-০১-১১ ২০:১২:২২ || আপডেট: ২০১৮-০১-১১ ২০:৫৩:৫০

এম আই খলিল
প্রধান প্রতিবেদক, সিটিজি টাইমস 

শীতের শুরু থেকে শুকিয়ে যাচ্ছে বর্ষায় ডুবিয়ে থাকা কর্ণফুলীর ৩টি শাখা খাল ও দুটি নদী। পানি শুকিয়ে বালুর চরে পরিণত হচ্ছে এসব খাল ও নদী। ফলে চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ইরি-বোরো ও সবজি চাষাবাদে সেচ সংকট দেখা দিয়েছে। অনাবাদি হয়ে পড়ছে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি।

খাল ও নদীগুলো হচ্ছে রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার মধ্যদিয়ে প্রবাহিত ইছামতি নদী, পদুয়া, শিলক ও সরফভাটা ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত শিলক খাল, ডং খাল, বোয়ালখালী ও পটিয়া উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ডলুখাল, রাউজান ও হাটহাজারী উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হালদা নদী।

এলাকার ধান ও সবজিসহ নানা ফসল উৎপাদনে এসব খাল ও নদী গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখে আসছে বলে জানিয়েছেন এতদঞ্চলের কৃষকরা।

চট্টগ্রাম জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, শস্যভান্ডার খ্যাত গুমাইবিলসহ রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় প্রায় ১৭ হাজার ৩০০ হেক্টর জমি ধান ও পাঁচ হাজার হেক্টর সবজি আবাদযোগ্য জমি রয়েছে। রাউজান উপজেলায় রয়েছে ১৪ হাজার ১০০ হেক্টর ধান ও ৩ হাজার ৩০০ হেক্টর সবজি, বোয়ালখালী উপজেলায় ৯ হাজার ৩০০ হেক্টর ধান ও ২ হাজার ৭০০ হেক্টর সবজি আবাদযোগ্য জমি। যা সম্পূর্ণ এসব খাল ও নদীর পানি সেচের ওপর নির্ভরশীল।

এছাড়া হাটহাজারী উপজেলার একাংশের প্রায় ২ হাজার ১০০ হেক্টর ধান, ৬০০ হেক্টর সবজি, পটিয়া উপজেলার একাংশের ১ হাজার ৯০০ হেক্টর ধান, ৭০০ হেক্টর সবজি আবাদযোগ্য জমিও এসব খাল ও নদীর পানি সেচের আওতায় রয়েছে। কিন্তু বর্ষা মৌসুমে এসব জমিতে চাষাবাদ হলেও শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে অর্ধেক জমিতেও ইরি-বোরো ও সবজি চাষাবাদ হয় না।

সূত্র আরও জানায়, চলতি মৌসুমে রাঙ্গুুনিয়ায় ৮ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো ও দেড় হাজার হেক্টর জমিতে সবজি চাষাবাদ, রাউজান উপজেলায় ৬ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো ও ৯০০ হেক্টর জমিতে সবজি, বোয়ালখালী উপজেলায় ৩ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো ও ৭০০ হেক্টর জমিতে সবজি চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এছাড়া হাটহাজারী উপজেলার দক্ষিণাংশে এক হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো ও ৪০০ হেক্টর জমিতে সবজি, পটিয়া উপজেলার উত্তর-পূর্বাংশে ৮০০ হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো ও ৩৫০ হেক্টর জমিতে সবজি চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পানি সেচ সুবিধা থাকলে আবাদযোগ্য সব জমিতে ইরি-বোরো ও সবজি চাষাবাদ করতে পারত কৃষকরা। এতে জড়িত প্রায় ৩০ হাজার কৃষকের ভাগ্য বদলে যেত। ঘুরে যেত জেলার অর্থনীতির চাকা।

কৃষকরা জানান, ভারতের আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্য থেকে হালদা ও ইছামতি নদীর উৎপত্তি। শিলক খাল, ডং ভাল ও ডলু খালের উৎপত্তি বান্দরবান জেলা থেকে। ফলে প্রতিবছর বর্ষায় উজান থেকে নেমে আসা পলিতে এসব খাল ও নদী ক্রমশ ভরাট হতে থাকে। হ্রাস পেতে থাকে পানির গভীরতা। ফলে বর্ষায় এসব খাল ডুবে উপচে পড়ে জনপদে। আর শীতে শুকিয়ে প্রায় মৃত হয়ে পড়ে। এতে দেখা দেয় সেচ সংকট। ব্যাহত হয় ধান ও সবজি চাষাবাদ। গত দুই দশক ধরে চলছে এ অবস্থা।

চলদি মৌসুমেও দেখা যায়, শীত শুরু হতে না হতে কর্ণফুলীর এসব শাখা খাল ও নদী শুকিয়ে বালুরচরে পরিণত হচেছ। চরের কারনে এসব নদীতে একটি নৌকাও চলাচল করতে পারছে না। সবকটি খাল ও নদী পায়ে হেটে পার হচ্ছে স্থানীয় লোকজন।

স্থানীয়রা জানান, এসব খাল ও নদীতে বর্ষা মৌসুমে প্রায় ৩-৪ ফুট পানি থাকে। জোয়ার-ভাটায় কর্ণফুলী নদী থেকে এসব খাল ও নদীতে পানি প্রবেশ করে। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে স্বাভাবিকের চেয়ে কর্ণফুলী নদীর পানিও হ্রাস পাওয়ায় এসব খাল ও নদী শুকিয়ে যায়। ফলে খাল ও নদী তীরবর্তি পাঁচ উপজেলায় চাষাবাদে ব্যাপক সেচ সংকট দেখা দেয়। সেচের অভাবে অর্ধেক জমি অনাবাদি থেকে যায়।

বোয়ালখালী উপজেলার শাকপুরা ইউনিয়নের কৃষক আবদুর রশিদ (৪৩) জানান, ইউনিয়নের শাকপুরা চরে তার আড়াই একর জমি রয়েছে। যেখানে সারাবছর শুধু সবজি চাষ হত। কর্ণফুলী নদীর শাখা ডলু খালের পানিই ছিল চরের জমি চাষাবাদের মূল উৎস। কিন্তু গত ১০-১২ বছর ধরে শীত মৌসুমে ডলু খাল শুকিয়ে মরে যায়।

তিনি বলেন, ১০-১২ বছর আগেও ডলু খালের গভীরতা ছিল প্রচুর। এ নদীতে তখন প্রচুর পরিমাণে দেশীয় প্রজাতির মাছও পাওয়া যেত। এ নদীর পানি দিয়ে শাকসবজি ও ধান চাষাবাদ করত চাষিরা। শাকপুরার চরসহ বোয়ালখালী উপজেলার সবকয়টি চরের জমিতে সবজি ও ধান চাষ করে স্বাবলম্বি হয়েছে অনেক কৃষক।

রাউজান উপজেলার উত্তর ভুর্ষি এলাকার কৃষক আমিনুল ইসলাম (৫১) বলেন, কর্ণফুলীর শাখা হালদা নদীর পানি সেচ দিয়ে ভূর্ষি চরের সবজি চাষ করে সংসারের ব্যয়ভার নির্বাহ করতাম আমি। কিন্তু বর্তমানে নদীর উজানে পানি শুকিয়ে যাওয়ায় সেচ সুবিধা কষ্টকর হয়ে দাড়িয়েছে। ব্যয়বহুল হয়ে দাড়িয়েছে ইরি-বোরো ধান ও সবজি চাষাবাদ। ফলে বিলের জমিতে অনেকে ধান ও সবজি চাষাবাদ করছে না।

রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার মুরাদনগর পৌর এলাকার ইছামতি চরের সবজি চাষি কফিল উদ্দিন(৩৮) জানান, চরে প্রায় সাড়ে ৩ শতাধিক চাষি সবজি ও অন্যান্য অর্থকরি ফসলের চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে। কিন্তু ইছামতি নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ায় চাষাবাদ করতে পারছে না। ফলে কৃষক পরিবারগুলো অভাব অনটনে দিন কাটাচ্ছে।

রাঙ্গুনিয়া উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রমিজ উদ্দিন জানান, রাঙ্গুনিয়া পৌরসভা ও ৪টি ইউনিয়নের ৪টি চরের প্রায় ৪ হাজার একর জমির ফসল উৎপাদন ইছামতি নদীর পানি সেচের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু গত দুই দশক ধরে ইছামতি নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ায় চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। পানির অভাবে ৪টি চরের ১০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিপুল পরিমাণ ফসলি জমি অনুৎপাদনশীল হয়ে পড়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রাম পওর বিভাগ-১ এর জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী বিদ্যূৎ কুমার সাহা এ প্রসঙ্গে বলেন, কর্ণফুলীর শাখা খাল ও নদীর পানির উপর গুমাই বিলসহ চট্টগ্রামের পাঁচ উপজেলার ধান ও সবজি চাষাবাদ নির্ভরশীল। কিন্তু এসব খাল ও নদী ভরাট হয়ে এখন মৃত প্রায়। হালদা নদীতেও পানির স্তর হ্রাস পাচ্ছে ক্রমশ। এ নদী রক্ষায় এখনই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ না নিলে অদুর ভবিষ্যতে খাল ও নদী তীরবর্তি উপজেলার বিলগুলো মরুভুমিতে পরিণত হবে।

চট্টগ্রাম জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, কর্ণফুলীর শাখা খাল ও নদীগুলো রক্ষার উদ্যোগ নেওয়া না হলে আগামি কয়েক দশকে তা হারিয়ে যাবে। ফলে পানির অভাবে পাঁচ উপজেলায় খাদ্যশস্য উৎপাদনে বিপর্যয় নেমে আসবে। দেখা দেবে খাদ্যভাব। এ ব্যাপারে বিভাগীয় পর্যায়ে একাধিকবার প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।

আপনার মতামত দিন....

ক্যালেন্ডার এবং আর্কাইভ

FriSatSunMonTueWedThu
   1234
19202122232425
262728293031 
       
    123
45678910
11121314151617