চট্টগ্রাম, , মঙ্গলবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

আস্থার সংকটে চট্টগ্রামের আবাসন ব্যবসা, ফ্ল্যাট কিনে প্রতারিত হচ্ছে মানুষ!

প্রকাশ: ২০১৮-০২-০৯ ১২:০৬:৩৫ || আপডেট: ২০১৮-০২-১০ ১৪:৫৭:০১

সিটিজি টাইমস প্রতিবেদক

অপ্রতুল ঋণ সুবিধা, গ্যাস-বিদ্যুতের নতুন সংযোগ না দেওয়া, শেয়ারবাজারের মন্দাসহ দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে এক ধরনের স্থবিরতা- এ সব কিছুর সম্মিলিত প্রভাবে ভালো নেই দেশের আবাসন খাত।

নগর ও শহরে পরিকল্পিত বসতির সংস্কৃতি চালুর পাশাপাশি নির্মাণ ও বিভিন্ন সহযোগী খাতের প্রসারের মাধ্যমে অর্থনীতিতে নিরন্তর অবদান রেখে চললেও নেতিবাচক ধারণা আবাসন খাতের পিছু ছাড়ে না। এ জন্য এক শ্রেণীর আবাসন ব্যবসায়ীর দায়ও কম নয়।

চট্টগ্রামে আবাসন ব্যবসায়ীদের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলছেন সাধারণ মানুষ। বিভিন্ন ডেভেলপার কোম্পানির চটকদার বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ হয়ে ফ্ল্যাট কিনে প্রায়ই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন তারা।

চুক্তি অনুযায়ী ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানকে কড়ায়-গন্ডায় পাওনা বুঝিয়ে দিয়েও সময়মত স্বপ্নের ফ্ল্যাটটি বুঝে পাচ্ছেন না ক্রেতারা।

সারা জীবনের সঞ্চয় অথবা চড়া সুদে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ফ্ল্যাট কেনার পর বর্তমানে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাতে হচ্ছে তাদের। বছরের পর বছর ডেভেলপার কোম্পানির অফিসে ধরনা দিয়েও ফ্ল্যাটে ওঠার সুযোগ পাচ্ছেন না।

২০১১ সালে চট্টগ্রামের আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান জেডপিডিএলের কাছ থেকে ৩৫ লাখ টাকায় ফ্ল্যাট বুকিং দেন সৌদিপ্রবাসী শওকত আলী। এর পর দীর্ঘ সাত বছর পেরিয়ে গেলেও কষ্টের টাকায় কেনা ফ্ল্যাটটি ঠিকমত বুঝে পাননি তিনি।

একই সময় ওই প্রকল্পে ৩৫ লাখ টাকায় ফ্ল্যাট বুকিং দিয়েছিলেন আরেক প্রবাসীর স্ত্রী হাজেরা বেগম। তাকেও ঠিকমত ফ্ল্যাট হস্তান্তর করেনি আবাসন প্রতিষ্ঠানটি।

শুধু শওকত আলী ও হাজেরা বেগম নন, চট্টগ্রাম নগরীর ডিসি রোডের ‘ইসলাম হাইটস’ নামে এ প্রকল্পে ফ্ল্যাট বুকিং দেয়া ২০ জন গ্রাহকের কেউই ফ্ল্যাট বুঝে পাননি ঠিকমত। অথচ এ প্রকল্পে ফ্ল্যাটের আকারভেদে তাদের প্রত্যেকেরই ৩০-৩৫ লাখ টাকা করে বিনিয়োগ রয়েছে।

এভাবে প্রতিনিয়ত গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করছে চট্টগ্রামের বিভিন্ন আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। এসব ঘটনায় প্রায় প্রতি মাসে চট্টগ্রামের কোনো না কোনো আদালতে আবাসন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে। গ্রাহকদের সঙ্গে আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের এমন প্রতারণার প্রভাব পড়ছে চট্টগ্রামের পুরো আবাসন খাতে।

জানা গেছে, গত তিন বছরে আরেক আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান চৌধুরী গ্রুপের কর্ণধার মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে অর্ধশতাধিক মামলা করেছেন বিভিন্ন গ্রাহক। একাধিক মামলায় প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মেয়াদে সাজাও হয়েছে।

গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয় আইডিয়াল রিয়েল এস্টেটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. শফিকুর রহমান ও তার স্ত্রী সায়মা আক্তার শম্পার বিরুদ্ধে। চুক্তি অনুযায়ী ফ্ল্যাট বুঝিয়ে না দেয়া এবং ৩০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুই গ্রাহকের দায়ের করা মামলায় চট্টগ্রাম মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এ পরোয়ানা জারি করেন।

এদিকে, চুক্তি অনুযায়ী ফ্ল্যাটে ওঠার পূর্ব পর্যন্ত জমির মালিককে বাসা ভাড়া দেয়ার কথা থাকলেও সেই প্রতিশ্রুতি পালন করেন না ডেভেলপাররা। আবার কখনো দেখা যায় নিজের কেনা ফ্ল্যাটটি বিক্রি হয়ে গেছে অন্য এক ব্যক্তির কাছে।

বর্তমানে আবার শুরু হয়েছে ‘টাইম শেয়ারিং’ নামে নতুন এক ধরনের প্রতারণা। একই ফ্ল্যাট বিক্রি করা হয় ১০ থেকে ১২ জনের কাছে। বছরের বিভিন্ন সময় তারা একই ফ্ল্যাটে ওঠার সুযোগ পান।

অথবা ওই ফ্ল্যাট ভাড়া দিয়ে ভাড়ার টাকা আনুপাতিক হারে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন।

অনেকের অভিযোগ, ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান মালিকদের মধ্যে অনেকে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসবাস করলেও ক্রেতাদের জন্য ফ্ল্যাট তৈরি করেন দায়সারাভাবে।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলেন, নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে তৈরি করা হয় বলে এসব ফ্ল্যাটে বসবাস করা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। মাঝারি মাপের ভূমিকম্প হলেই ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ঘটে যাবে বন্দরনগরীতে। অনেক ফ্ল্যাট নির্মিত হয়েছে সিডিএ’র নকশা লংঘন করে। হাতে গোনা কয়েকটি ছাড়া প্রায় শতভাগ অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিবেশ ছাড়পত্রের শর্ত অনুসরণ করা হয়নি।

কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া কোনো অ্যাপার্টমেন্টেই নেই আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা। প্লাম্বিং ও ইলেকট্রিক্যাল কাজের তদারকিতে উচ্চ শিক্ষিত প্রকৌশলী নিয়োগ না করে কাজ করানো হয় সাধারণ মিস্ত্রি দিয়ে।

ডেভেলপারদের এহেন স্বেচ্ছাচারিতার কাছে অসহায় হয়ে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা।

ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান মালিকদের সংগঠন রিহ্যাবের কাছে অভিযোগ করেও এর কোনো সমাধান মিলছে না। তারা ক্রেতার চেয়ে মালিকদের স্বার্থ সংরক্ষণেই বেশি ব্যস্ত বলে ক্রেতারা অভিযোগ করেছেন। রিহ্যাবের অনেক নেতার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও রয়েছে নানা অভিযোগ।

এমনও অভিযোগ পাওয়া গেছে যে, রিহ্যাব সদস্যদের কেউ কেউ প্রতারণার মাধ্যমে বিপুল অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়ে পাড়ি জমিয়েছেন কানাডা, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে। ডেভেলপার নামধারী প্রতারকচক্র অ্যাপার্টমেন্ট করার জন্য নেয়া জমির বিপরীতে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বিদেশে পালিয়ে গেছে। এ কারণে অনেক জমির মালিকও দীর্ঘমেয়াদি আইনী সমস্যায় পড়েছেন।

ডেভেলপারদের জমির ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ দিয়ে ‘এ কূল ও কূল- দুই কূলই’ হারিয়েছেন তারা। ফলে জমির মালিক অন্য কোনো ডেভেলপারের সাথেও নতুন করে কোনো চুক্তি করতে পারছেন না।

এসব নানাবিধ কারণে চট্টগ্রামে আবাসন ব্যবসায়ীদের প্রতি আস্থার চরম সংকট সৃষ্টি হয়েছে। ডেভেলপারদের নানামুখী প্রতারণার ঘটনায় নতুন করে কেউ ফ্ল্যাট কেনায় আগ্রহী হচ্ছেন না। এর প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামে চলমান রিহ্যাব ফেয়ারে।

নগরীর অভিজাত একটি হোটেলে চারদিনব্যাপী এই মেলা শুরু হয়েছে গত বৃহস্পতিবার থেকে। কিন্তু এই মেলায় ক্রেতাদের পক্ষ থেকে তেমন একটা সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। ৮ ফেব্রুয়ারি সকালে মেলার উদ্বোধন করবেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান আব্দুচ ছালাম। তিনি বলেন, সিডিএ’কে বাদ দিয়ে আবাসনখাতে ব্যবসা করা অসম্ভব। এক্ষেত্রে অবশ্যই আবাসন ব্যবসায়ীকে আইনের আওতায় থাকতে হবে। কেউ যাতে প্রতারিত না হয়।

রিহ্যাব চট্টগ্রাম জোনাল স্ট্যান্ডিং কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী এসএম আবু সুফিয়ান এ প্রসঙ্গে গনমাধ্যমকে বলেন, রিহ্যাবের সদস্য নয়, এমন প্রতিষ্ঠান দ্বারা বেশির ভাগ গ্রাহক প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। রিহ্যাব ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের বিভিন্নভাবে সহায়তার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এ প্রতারণা চট্টগ্রামের পুরো আবাসন খাতকে বিপাকে ফেলেছে।

আপনার মতামত দিন...

ক্যালেন্ডার এবং আর্কাইভ