চট্টগ্রাম, , রোববার, ২২ এপ্রিল ২০১৮

বিমান দূর্ঘটনা ও কিছু কথা

প্রকাশ: ২০১৮-০৩-১৯ ১২:৩৭:৫১ || আপডেট: ২০১৮-০৩-১৯ ১২:৩৭:৫১

এটিএম মোসলেহ উদ্দিন (জাবেদ)

প্রায় ৩৪ বছর পর বড় কোন দূর্ঘটনার শিকার হলো বাংলাদেশী বিমান সংস্থার বিমান। গত সোমবার (১২ মার্চ) স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ২০ মিনিটে নেপালের রাজধানী ও পার্বত্য শহর কাঠমান্ডুর ত্রিভূবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরনের সময় ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিএস২১১ ফ্লাইটের ড্যাশ-৮ কিউ-৪০০ মডেলের বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। ঢাকা থেকে যাওয়া ৭৮ আসনের এই বিমানটিতে ২জন পাইলট ও ২জন ক্রুসহ মোট ৭১জন যাত্রী ছিলেন। বিভিন্ন মাধ্যমের সূত্রমতে এখন পর্যন্ত ২৬জন বাংলাদেশীসহ ৫০জন মৃত্যুবরন করেছে। বাকীরা কাঠমান্ডুর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আছেন। এর আগে ১৯৮৪ সালের ৫ আগষ্ট চট্টগ্রাম থেকে আসার সময় বিরূপ আবহাওয়ার কারণে ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণ করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় বিমানসংস্থা বাংলাদেশ বিমানের ফকার এফ-২৭-৬০০ মডেলের একটি বিমান বিমানবন্দরের কাছাকাছি একটি জলাশয়ে বিধ্বস্থ হলে পাইলট, ক্রু সহ ৪৯জন যাত্রীর প্রাণহানি ঘটে। বর্তমানে কাঠমান্ডুর দূর্ঘটনাটিকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিমান দূর্ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। নিহতদের সম্মানার্থে সরকার বৃহষ্পতিবার (১৫ মার্চ) রাষ্ট্রীয় শোকদিবস ঘোষণা করেছে ও শুক্রবার (১৬ মার্চ) সারাদেশে সকল ধর্মীয় প্রার্থনালয়ে বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

নেপালের একটি সংবাদ মাধ্যমের মাধ্যমে ইউটিউবে আপলোডকৃত এটিসির (এয়ারট্রাফিক কন্ট্রোল) সঙ্গে পাইলটের কথোপকথনের রেকর্ড সারাবিশে^ ছড়িয়ে পড়েছে। তা শুনে ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষ সংবাদ মাধ্যমে ত্রিভূবন বিমানবন্দরের এটিসি টাওয়ারের ভুল নির্দেশনাকে উক্ত দূর্ঘটনার জন্য সন্দেহ করেছেন বলে জানিয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে বৈমানিকরা বলছেন, এটিসির নির্দেশনার ফলে ককপিট বিভ্রান্ত হয়েছে এবং এটি এটিসির ভুল। তাদেও ভুলের কারনে এমন মারাতœক মাশুল দিতে হলো কতগুলো তাজা প্রাণকে। নেপাল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে ত্রিভূবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ৬জন এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল অফিসারকে বদলী করেছে। যা ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষ ও বৈমানিকদের সন্দেহকে আরো জোরালো করে তুলেছে। এই অডিও ভয়েস শুনে যে কেউ সহজেই বুঝতে পারবে, অল্প সময়ের মধ্যে এটিসির দুই ধরনের নির্দেশনার কারনে পাইলট হয়ত বিভ্রান্ত হয়েছে।

দূর্ঘটনা কবলিত বিমানটির ধ্বংসস্তুপ থেকে বিমানের ব্ল্যাকবক্স ও কথোপকথনের রেকর্ড উদ্ধার করা হয়েছে। যা থেকে বেরিয়ে আসবে দূর্ঘটনার প্রকৃত কারন। ইতোমধ্যে নেপালের বেসামরিক বিমানচলাচল কর্তৃপক্ষের সাবেক একজন মহাপরিচালকের নেতৃত্বে ৬ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। গত মঙ্গলবার (১৩ মার্চ) থেকে কমিটি কাজ শুরু করেছে। ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষও তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। বাংলাদেশের বেসামরিক বিমানচলাচল কর্তৃপক্ষও দূর্ঘটনার কারন অনুসন্ধানে তদন্ত করবে। সেই সাথে বিমান তৈরীকারক প্রতিষ্ঠান কানাডিয়ান বোম্বার্ডিয়ার কর্তৃপক্ষ, ইন্সুরেন্স কোম্পানীসহ বিমান চলাচল বিষয়ক অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও তদন্তে অংশ নিবেন। আমাদের চাওয়া এই দূর্ঘটনার প্রকৃত কারন বেরিয়ে আসুক ও তার প্রতিকারে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হউক।

পৃথিবীর সবদেশে যখন বিমান চলাচল আরও নিরাপদ করার কাজ চলছে, নেপাল তখন প্রতিনিয়ত বিমান দূর্ঘটনার জন্য শিরোনাম হচ্ছে। এভিয়েশন সেফটি নেটওয়ার্ক (এএসএন) এর তথ্য মোতাবেক সোমবারের দূর্ঘটনাসহ গত আট বছওে ত্রিভূবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে (টিআইএ) নয়টি দূর্ঘটনা ঘটেছে। বৈমানিকদের মতে, কাঠমান্ডুর বিমানবন্দরে বিমান নামানোর ক্ষেত্রে পাইলদেরকে সবসময় চ্যালেঞ্জের মুখে থাকতে হয়। সেখানে রানওয়ের একপ্রান্তের ঠিক পিছনেই পাহাড়, পাহাড় পেরোনোর পর খুব দ্রুত পাইলটকে বিমান নামাতে হয় রানওয়েতে। রানওয়ের একপাশে কিছুটা সমতল জায়গা রয়েছে, আরেকপাশে রয়েছে গভীর খাঁদ। যার কারনে এটি বিশে^র ১০টি ঝুঁকিপূর্ণ বিমানবন্দরগুলোর একটি। ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশন নেপালে বিমান দূর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা কমানোর চেষ্টা করছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, দেশটি খুবই সুন্দর কিন্তু অসমতল ভূমির কারনে সেখানে বিমান পরিচালনা পৃথিবীর অন্যান্য জায়গার চেয়ে বেশিঝুঁকিপূর্ণ।

এই ঝুঁকি আরো বেড়ে যায়, যখন নেপালের অভ্যন্তরীন বিমান সংস্থাগুলো পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ উড়োজাহাজ ব্যবহার করাতে। এছাড়া নেপালের সব এয়ারলাইন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে নিষিদ্ধ। কারন, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের নিরাপত্তা বিষয়ক কর্মকর্তারা নেপালের সিভিল এভিয়েশন অথরিটি ও নীতিনির্ধারকদের বিশ^াস করেনা বলে জানিয়েছে ব্রিটেনের দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকা। ’ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এয়ার সেফটি লিস্ট’ হল একটি বিপদজ্জনক বিমানসংস্থার নামের তালিকা। এই তালিকায় অন্তর্ভূক্ত বিমানসংস্থাগুলো বেশিরভাগই খুবই স্বল্প পরিচিত ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদন্ড বা সেফটি স্ট্যান্ডার্ড মেনে চলতে অক্ষম। নেপালের ১৭টি এয়ারলাইনের সবগুলোই এ তালিকায় রয়েছে।

এএসএন এর তথ্যানুযায়ী সারাবিশে^ ২০১৭ সালে বড়ধরনের কোনবিমান দূর্ঘটনা না ঘটায় বছরটি ছিল বিমান চলাচলের একটি নিরাপদ বছর। কারন ২০১৭ সালেবিশে^র কোথাও কোন যাত্রীবাহী বিমান বিধ্বস্থের ঘটনা ঘটেনি। যা আস্থা ও স্বস্তি এনে দিয়েছিল আকাশ পথে ভ্রমণকারীদের মনে। তেমনি ২০১৭ সাল আমাদের দেশের বিমান চলাচলের ইতিহাসেও একটি নিরাপদ বছর হিসেবে পার করে। সেই সাথে বাংলাদেশের বেসরকারি বিমানসংস্থাগুলো গত বেশ কয়েক বছর মোটামুটি একটা আস্থার জায়গায় আসতে স্বক্ষম হয়েছিল। শিডিউল মেনেচলা, যাত্রী পরিসেবার মানবৃদ্ধি সহ সব মিলিয়ে ভালভাবেই চলছিল। কিন্তু গত সোমবারের এই ঘটনার পর হয়ত একটা বিপরীত প্রভাব আসতে পারে। বিমান যাত্রীসহ সাধারন মানুষের মনে একটা ভীতি মূলক মনোভাব কাজ করতে পারে। এরই প্রেক্ষিতে একটা সাময়িক স্থবিরতা কাজ করতে পারে। এর সুদূর প্রসারী কোন প্রভাব হয়ত থাকবে না। মানুষের আস্থা ঠিক রাখার জন্য সরকার ও বিমানসংস্থাগুলো সংকটময় সময়গুলোতে ঠিকমত তথা যথাযথ ভাবে কাজ করতে হবে। বিপদ আপদ থাকবেই, কিন্তু মানুষ দেখতে চায় বিপদে তারা কি রকম সাহায্য বা রেসপন্স পাচ্ছে।

সোমবারের বিমান দূর্ঘটনায় আহত যাত্রীদের যথাযথ চিকিৎসা ও সেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরো ভালোভাবে কাজ করতে হবে। আমাদের মাননীয় মন্ত্রীমহোদয় ইতিমধ্যে দূর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও হাসপাতালে আহতদের দেখেছেন। নিহত ও আহতদের স্বজনদেরকে ইতিমধ্যে নেপালে নেয়া হয়েছে। এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ ও বিমানসংস্থাকে নিহতদেও লাশ ফিরিয়ে এনে তাদের স্বজনদের হাতে পৌঁছে দেয়ার জন্য কাজ করতে হবে। নিয়মানুযায়ী প্রত্যেকের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন মাধ্যমে জানা গেছে, নেপালে পোড়া রোগীদের জন্য যথাযথ চিকিৎসা নেই। যদি না থাকে তাহলে আহত বাংলাদেশীদেরকে এয়ার এ্যম্বুলেন্সেকরে দেশে ফিরিয়ে এনে যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। মারাতœক আহতদেও আরো উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর বা থাইল্যান্ডের উন্নত হাসপাতালগুলোতে পাঠানো যেতে পারে। স্বজন হারানোদেও প্রতি সহমর্মিতা ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। এভাবে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে কাজ কওে যথাযথ সেবা নিশ্চিত করে, সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কাজ করতে হবে।

লেখক:  প্রাবন্ধিক ও কবি। সহকারী মহাব্যবস্থাপক (মানব সম্পদ ও প্রশাসন), ক্রাউন সিমেন্ট গ্রুপ।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। সিটিজি টাইমস -এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই সময়ের কথা বিভাগে প্রকাশিত লেখার জন্য সিটিজি টাইমস কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

আপনার মতামত দিন...

আপনার মতামত দিন...

ক্যালেন্ডার এবং আর্কাইভ

Open

Close