চট্টগ্রাম, , রোববার, ২২ এপ্রিল ২০১৮

পাখির প্রতি ভালোবাসা

প্রকাশ: ২০১৮-০৩-২৮ ১৫:৫৫:২২ || আপডেট: ২০১৮-০৩-২৮ ১৫:৫৫:২২

ফজলুর রহমান

কোনো একদিন বৈদ্যুতিক তারে একটি ঘুড়ি আটকে গিয়েছিল। রাজশাহী মহানগরীর আলুপট্টিতে। সেই ঘুড়ির সুতাটি ঝুলছিল। সে সুতায় আটকে যায় ছোট্ট এক চড়ুই পাখি। বাদুড়ের মতো উল্টো হয়ে ঝুলেছিল। ডানা ঝাপটে যাচ্ছিল। চড়ুইটির এ ডানা ঝাপটানো ছিল প্রাণে বাঁচার আকুতি।

বিষয়টি নজরে আসে স্থানীয় সংবাদকর্মী সৌরভ হাবিবের। প্রথমে তিনি পাখিটিকে সুতা থেকে ছাড়ানোর কথা ভাবেন। কিন্তু আশপাশে লম্বা কোনো বাঁশ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তাই কিছুটা সংশয় নিয়েই ফোন করেন ফায়ার সার্ভিসে। ভাবছিলেন, ছোট্ট একটা পাখির প্রাণ বাঁচাতে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আসবেন কিনা!

কিন্তু ফোন পাওয়ার মিনিট দশেকের মধ্যেই ঘটনাস্থলে হাজির হয় ফায়ার সার্ভিসের দুটি গাড়ি। সৌরভ হাবিব ভাবেন, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা হয়তো চড়ুই পাখির কথা বুঝতে পারেননি, তাই দুটি গাড়ি এনেছেন। তাই তিনি ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের জানান আটকে থাকা চড়ুই পাখির কথা। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তাকে বলেন, চড়ুই পাখির কথা জানতে পেরেই তারা এসেছেন! এরপর অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গেই লম্বা মই দিয়ে উঠে বৈদ্যুতিক তার থেকে সুতাটি কেটে দেন তারা। সঙ্গে সঙ্গে মনের আনন্দে কিচির-মিচির শব্দ করে উড়ে যায় পাখিটি।

পাখি রক্ষার এ সুন্দর সংবাদটি প্রকাশিত হয় গত ১৫ মার্চ দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন-এর শেষ পাতায়। পাখির প্রাণ রক্ষায় ফায়ার সার্ভিসকে ফোন করা এবং ফায়ার সার্ভিসের এই ভূমিকা সবার জন্য অনুকরণীয়।

আসলে প্রতিটি সৃষ্টির আলাদা মর্যাদা আছে। কোনো জীবনই ক্ষুদ্র নয়, কোনো প্রাণীই সামান্য নয়। বিশাল এ প্রকৃতির রাজ্যে জীবনটা পারস্পরিক, সামষ্টিক। চোখ ফেরালেই আমাদের চারপাশে এখনো দেখি কত মায়াবী আর কত আদুরে সব পাখি! তাদের প্রতি ভালোবাসা কেমনে কমবে!!

পাখি পালক ও পাখাবিশিষ্ট দ্বিপদী প্রাণী। কিছু পতঙ্গ এবং বাদুড়ের পাখা থাকলেও কেবল পাখিদেরই পালক আছে। সারা বিশ্বে প্রায় ১০ হাজার প্রজাতির পাখির সন্ধান পাওয়া যায়। এর মধ্যে ১২ শ প্রজাতির পাখি এখন বিলুপ্তির পথে। বাংলাদেশেও প্রায় ৪৬৬ টি প্রজাতির পাখি বাস করে। এর মধ্যে ১২/১৩ প্রকার পাখি এখন আর দেখা যায় না। ভাবা হচ্ছে, খাদ্য ও বসতি নষ্ট হওয়ায় এরা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আমাদের দেশে যা পাখি আছে, তার ৫০% পরিযায়ী। এরা এদেশে আসে, একনাগাড়ে সারা বছর থাকে না।

বেশিরভাগ পাখিই সামাজিক জীব। এরা দৃষ্টিগ্রাহ্য সংকেত, ডাক বা শিষের মাধ্যমে একজন আরেকজনের সাথে যোগাযোগ করে। বিভিন্ন সামাজিক কার্যকলাপেও এরা অংশ নেয়, যেমন- একই ঋতুতে প্রজননে অংশ নেয়া, একসাথে কলোনি করে বাসা করা, ঝাঁক বেঁধে উড়ে বেড়ানো, দলবদ্ধ ভাবে খাবার খোঁজা এমনকি দল বেঁধে শত্রুকে তাড়িয়ে দেয়া। মানুষের মতোই পাখিদের প্রেম-বিরহ, হাসি-কান্না এবং জীবন পরিক্রমা আছে। আছে ভাষা, তারা কান পেতে শোনে মানুষের কথা। বোঝে তাদের প্রতি মানুষের ভালোবাসা বা বিরূপতা। আমাদের কত প্রাচুর্য আর কতসব খাবার। অথচ শ্রমনিষ্ঠ পাখিরা সারাদিন খুঁজে বেড়ায় আহার। পক্ষিকুল মানবজাতির উপকারী, পরিবেশবান্ধব এবং পৃথিবীর সৌন্দর্যের একটি প্রতীক। পাখিরা প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য সুরক্ষা করে। যখন দল বেঁধে চক্রাকারে পাখিরা আকাশে চক্কর দেয় এবং কিচিরমিচির শব্দ করে ঘুরে বেড়ায়, তখন কলকাকলির এমন দৃশ্যাবলি দেখে মানুষ চরম আনন্দে বিমোহিত হয়।

নানা বর্ণ ও বহু প্রজাতির পাখির মধ্যে জলচর, স্থলচর এবং উভচর পাখি রয়েছে। কিছু কিছু পাখি বাড়িঘরের আঙিনায় বাস করে; যেমন চড়ুই, টুনটুনি, কবুতর প্রভৃতি। বাড়ির আশপাশে বন-জঙ্গলে বাস করে; যেমন দোয়েল, কোকিল, শালিক, শ্যামা, বুলবুলি, ঘুঘু, ডাহুক, কাক, চিল, ঈগল ইত্যাদি বিরাজমান। অধিকাংশ পাখিই জলাভূমিতে খাল-বিল, হাওর-বাঁওড় এবং নদ-নদীতে ভেসে বেড়ায়।

পাখিরা পৃথিবীব্যাপী চলাফেরা করে। বাংলাদেশে নানা প্রজাতি ও নানা রঙের বহু পাখির বাস থাকা সত্ত্বেও ঋতুর বিবর্তনে বিশ্বের শীতপ্রধান দেশ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে অতিথি পাখি ডানা ঝাপটে প্রাকৃতিক জলাশয়গুলোতে ক্ষণস্থায়ী আবাস গড়ে। প্রচন্ড শীত থেকে রক্ষা পাওয়ার এবং জীবন বাঁচানোর জন্য অতিথি পাখিরা খাদ্যের আশায় এ দেশে আসে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে এরা বিশাল দূরত্ব অতিক্রম করে আসে আমাদের দেশে। তখন বিলগুলো অপরূপ সৌন্দর্যে ভরে ওঠে। এগুলো দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে। আমাদের পর্যটন খাতকে আরো সম্ভাবনাময় করে তোলে। অতিথি পাখিদের প্রতি অত্যাচার হলে ওরা ভয় পেয়ে চলে যায় স্বদেশে, যে কারণে প্রকৃতি হারায় তার সৌন্দর্য। তাই এসব অতিথি পাখির প্রতি ভালোবাসা, সদয়-সুন্দর ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ সৃষ্টিজীবের প্রতি সেবা প্রদর্শনেরই একটি অংশ।

পৃথিবীর কোনো গবেষণায় জানা যায়নি যে, পাখি মানুষের ক্ষতি করে। বরং নানাভাবে এরা মানুষের উপকার করে। নির্বিচারে চড়ুই পাখি হত্যার পরিণামে ভয়ানক প্রাকৃতিক দুর্যোগের শাস্তি ভোগ করেছিল চীন। চড়ুই ফসলের ক্ষতি করে, এ ভ্রান্ত ধারণায় পঞ্চাশের দশকে মাও সেতুংয়ের নির্দেশে লাখ লাখ চড়ুই নিধন করা হয়, পুরস্কৃত করা হয় নিধনকারীদের। কিন্তু ঠিক ৪-৫ বছরের মাথায় চড়ুইয়ের অভাবে শস্যক্ষেত্রে পোকামাকড়ের বিধ্বংসী আক্রমণে খাদ্য সংকটের কবলে পড়ে চীন। দুর্ভিক্ষে মারা যায় প্রায় ২০ মিলিয়ন মানুষ। এরপর আবার শুরু হয় চড়ুই রক্ষার আন্দোলন। আসলে পাখিরা ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে কৃষকের ফসল রক্ষা করে, পানির অসুস্থ ও দূর্বল মাছ খেয়ে অন্যান্য সবল মাছ ও জলজ উদ্ভিদকে রক্ষা করে, ইঁদুর খেয়ে কৃষকের উপকার করে। পাখির বিষ্টা হাওর, বাওর ও বিলের মাটিতে মিশে ওই মাটি ফসফরাস ও ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ হয়। ফলে মাটির উর্বরাশক্তি বেড়ে যায় কয়েকগুণ। যদি পাখি বিলুপ্ত হয়ে যায় তাহলে একদিকে আমরা যেমন হারাব প্রকৃতির সৌন্দর্যকে, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে হুমকির মুখে পড়বে আমাদের পরিবেশ।

পাখ-পাখালিকে অহেতুক হত্যা করা বা শিকার করা ধর্মীয় দৃষ্টিতে অন্যায় এবং প্রচলিত আইনেও দন্ডনীয় অপরাধ। পাখ-পাখালির জীবন রক্ষা করে পাখিদের লালন-পালন প্রশংসনীয় ও পুণ্যের কাজ। এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত শতকে জীববৈচিত্র কমেছে আগের চেয়ে প্রায় একশ’ গুণ বেশি হারে৷ জীববৈচিত্র্য কমে যাওয়ার কারণ মানুষ৷ যুক্তরাষ্ট্রের কিছু বিশ্ববিদ্যালয় এ বিষয়ে প্রকাশিত এক যৌথ প্রতিবেদনে বলেছে, ‘বণাঞ্চলে মানুষের যাতায়াত বেড়ে যাওয়ার কারণেই উদ্ভিদ এবং প্রাণীর বিলুপ্তি দ্রুততর হচ্ছে৷’ নগরায়ণ যতই প্রসারিত হচ্ছে, ততই বিলুপ্ত হচ্ছে পাখিদের জলাধার, খাবার, ঝোপঝাড়। পাখিকুল হয়ে পড়েছে ছিন্নমূল। তারা এখন খুব শীতার্ত, ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত এবং টিক থাকার জন্য জীবনযুদ্ধে লিপ্ত।

অপরিকিল্পত নগরায়ণ, ধোঁয়া ও ধুলার আস্তরণ, অগণিত এসির সিএফসি গ্যাসের আগ্রাসন, বন ধ্বংস, বাড়ি/প্রতিষ্ঠানে গাছপালা কমে যাওয়া, জলজ উদ্ভিদ কমে যাওয়া, জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়া, বিভিন্ন প্রকার ফাঁদ, বিষটোপ ও জালের মধ্যমে পাখি ধরা ও মারা, কৃষিজমিতে কীটনাশক ব্যবহার, খাদ্যাভাব ইত্যাদি পাখি বিলুপ্তি ও সংখ্যা কমার অন্যতম কারণ। পাখি শিকার বন্ধ হলে, পাখির বাসস্থান ও খাবারের নিশ্চয়তা সৃষ্টি করা গেলে, অবশ্যই পাখির কলকাকলি বৃদ্ধি পাবে। ফিরে আসবে পরিবেশের ভারসাম্য ও নান্দনিকতা। বাংলাদেশে পাখি শিকারে আইন থাকলেও প্রায়ই দেখা যায়, এখনো খাঁচায় করে বিক্রি হচ্ছে নানা প্রজাতির বিরল পাখি। এ ব্যপারে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। ঝড়ে মারা যায় হাজার হাজার পাখি। তাই যে সব পাখি বিলুপ্তির পথে সেগুলোর জন্য কৃত্রিম উপায়ে বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। ঐসব প্রজাতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। জমিতে কীটনাশক ব্যবহারের ফলেও জীবননাশ ঘটছে অসংখ্য পাখির। তাই কীটনাশকের বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে। পাখিদের প্রতি জনসাধারণের সচেতনতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এদের বংশ বৃদ্ধি এবং সংরক্ষণে আরো পদক্ষেপ গ্রহণ বিশেষভাবে প্রয়োজন। পাখিদের জন্য অভয়ারণ্য সৃষ্টি করে এদের হত্যা ও উত্ত্যক্তকারীদের যথাযথ শাস্তির বিধান কার্যকর করা উচিত।

পাখি প্রকৃতির অনবদ্য দান। পল্লবঘন এলাকায় পাখির কলকাকলিতে মন ভরে ওঠে। পাখির ডাকে সূচিত হয় শুভ সকাল। আবার পাখির ডাকে নেমে আসে গোধূলির শেষ আলো। যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই একটা রিপোর্ট করেছিল যে, তাদের দেশের অধিকাংশ সিরিয়াল কিলারদের ‘অ্যানিমেল অ্যাবিউজ’ করার ‘ব্যাকগ্রাউন্ড’ আছে৷ এর ফলে ধারণা মিলছে যে, ছোটবেলা থেকে প্রাণীদের ওপর নির্যাতন করার প্রবণতা থাকলে এবং সেটা নিয়ে কেউ যদি কিছু না বলে, তাহলে তারা বড় হয়ে মানুষের প্রতিও অমানবিক আচরণ করে৷ পশু-পাখিরা আমাদের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত৷ আমরা যদি পশু-পাখির প্রতি সহানুভূতি না দেখাতে পারি, তাহলে মানুষের প্রতিও সহানুভূতি দেখাতে পারবো না৷ তাছাড়া পশু-পাখি এত নিষ্পাপ, এত ‘ইনোসেন্ট’, যা আমরা মানুষের মধ্যেও পাবো না৷
পাখি অপূর্ব সৃষ্টির নাম। প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়াতে পাখি রূপ ছড়িয়ে আছে ডানায় ডানায়। পাখির সৌন্দর্যের কারণেই পাখির প্রতি মানুষের ভালোবাসা জন্মায়। শিশুর কোমল হৃদয়ে পাখির প্রতি ভালোবাসা, বাউলের গানে পাখির সুর, কবিতায়ও থাকে পাখির উপমা। সেই প্রকৃতিবান্ধব পাখিদের প্রতি মানুষকে আরো সহানুভূতিশীল হতে হবে। পাখি রক্ষা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। আসুন, পাখিকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে সবাই এগিয়ে আসি। ভালোবাসতে শিখি পাখিদের। সুন্দর করে তুলি নিজেদের পরিবেশকে। মানুষ ও পাখির সখ্যে পূর্ণ হয়ে উঠুক প্রতিটি বাড়ি-প্রতিষ্ঠান। চলুন নিশ্চিত করি, পাখিদের জন্য নিরূপদ্রব আবাসন, বিচরণ ও জীবনধারণ। শত ব্যস্ততার মাঝে যেন আমরা উন্মেষ ঘটাই পাখিদের প্রতি মমত্ববোধের।

লেখক: সহকারী রেজিস্ট্রার (সমন্বয়), ভাইস চ্যান্সেলর অফিস এবং সভাপতি, চুয়েট বার্ড ক্লাব, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। সিটিজি টাইমস -এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই সময়ের কথা বিভাগে প্রকাশিত লেখার জন্য সিটিজি টাইমস কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

আপনার মতামত দিন...

আপনার মতামত দিন...

ক্যালেন্ডার এবং আর্কাইভ

Open

Close