চট্টগ্রাম, , বুধবার, ২৫ এপ্রিল ২০১৮

সাতকানিয়ায় ফসলি জমির ‘টপ সয়েল’ যাচ্ছে ইটভাটায়, বিপন্ন পরিবেশ

প্রকাশ: ২০১৮-০৪-০৫ ১৩:৪৭:৫১ || আপডেট: ২০১৮-০৪-০৬ ১১:৫৯:৫২

সিটিজি টাইম্‌স প্রতিবেদক 

সাতকানিয়ায় বিভিন্ন এলাকার ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি টপ সয়েল কেটে ইটভাটায় নেওয়া হচ্ছে। নগদ টাকার আশায় জমির মালিকরা মাটি বিক্রি করে দিচ্ছেন। এদিকে মাটির ওপরের স্তর কেটে নেওয়ায় জমিগুলো অনুর্বর হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষি কর্মকর্তারা।

ভূমি আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এক শ্রেণির দালাল ফসলি জমির টপ সয়েল কেটে উজাড় করছে। ফলে এলাকার পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন ও ফসল বৈচিত্র্য মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।

সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, উপজেলার চরতী, খাগরিয়া, নলুয়া, কাঞ্চনা, আমিলাইশ,  এওচিয়া, মাদার্শা,  ঢেমশা, কেঁওচিয়া, কালিয়াইশ,  ধর্মপুর, বাজালিয়া, পুরাণগড় ও ছদাহা ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় এক্সকাভেটর দিয়ে কৃষি জমির উপরিভাগের উর্বরা অংশ কেটে ট্রাক-ট্রলি করে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। আর এসব মাটি যাচ্ছে সাতকানিয়ার ৫৭ টি ইটভাটায়। তাছাড়া বসতভিটা ও পুকুর ভরাট কাজেও এঁটেল মাটির ব্যাপক চাহিদা বেড়েছে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মাটি কাটার গভীরতার পরিমাণ ৫ থেকে ১০ ফুট পর্যন্ত ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে কোথাও কোথাও অর্থনৈতিক ও অনৈতিক আগ্রাসনে পার্শ্ববর্তী মালিকের জমিও নষ্ট হচ্ছে।

কৃষি বিজ্ঞানের ভাষায় যে কোনো ফলনযোগ্য জমির উৎপাদন শক্তি জমা থাকে মাটির ৬ থেকে ১৮ ইঞ্চি গভীরতায়। মাটির এই অংশেই যে কোনো ফসল বেড়ে ওঠার গুণাগুণ সুরক্ষিত থাকে। বীজ রোপণের পর এই অংশ থেকেই ফসলটি প্রয়োজনীয় উপাদান গ্রহণ করে। এই অংশটি একবার কেটে নিলে সে জমির আর মৃত্তিকা প্রাণ থাকে না। এমনকি ওই জমিতে ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে কোনো ফসল বেড়ে উঠবে না। এতে জমিটি পরিত্যক্তই হয়ে যায়।

জানা যায়, কৃষি জমির টপ সয়েল কেটে নেয়ার কারণে ফসলের প্রধান খাদ্য নাইট্রোজেন, ফসফরাস, আয়রন, জিংক, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাসিয়ামসহ বিভিন্ন জৈব উপাদানের ব্যাপক ঘাটতি হচ্ছে। অন্যদিকে চলাচলে নিষেধ থাকলেও মাটি ভর্তি ভারি ট্রাক, ড্রাম, ট্রাক ও ট্রলি চলাচল করায় গ্রামীণ রাস্তাঘাট ভেঙে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ইটভাটার তত্ত্ববধায়ক জানান, মাটি ব্যবসায়ীরা তাদের ইটভাটার মাটি সরবরাহ করে থাকে। ভাটা মালিকরা কেউ টপ সয়েল কাটায় সরাসরি জড়িত নয়।

কেরানিহাট এলাকায় মাটি কাটার কাজে নিয়োজিত শ্রমিক আবদুল হামিদ (৩৬) বলেন, দিনমজুর হিসেবে কাজ করে দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরি পায়। মাটি ব্যবসায়ীরা আমাদের কাজে নিয়ে আসছেন।

সাতকানিয়ায উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ মোবারক হোসেন সিটিজি টাইম্‌সকে বলেন,  মাটি কাটার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে দফা দফা অভিযান চালানো হছে। এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।

জানতে চাইলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শোয়েব মহামুদ সিটিজি টাইম্‌সকে বলেন, সাধারণ কৃষকদের অসচেতনতার সুযোগে এক শ্রেণির মাটি ব্যবসায়ীরা কৃষি সম্পদের সর্বনাশ করছে। এ ব্যাপারে মাঠ পরিদর্শন করে শিগগির কৃষকদের বুঝানোর চেষ্টা করা হবে।

তিনি আরো এ অঞ্চলে উদ্বেগজনকভাবে জমির টপ সয়েল বিক্রি হচ্ছে। টপ সয়েলের ৬ ইঞ্চির ভেতরে মাটিতে পুষ্টি থাকে। ফসল এ পুষ্টি থেকে খাবার পায় এবং বেড়ে উঠে। আর টপ সয়েল কেটে নেওয়ার পর জমি উর্বরতা শক্তি হারাচ্ছে বলে তিনি আরো জানান। কৃষকদের টপ সয়েল বিক্রি করতে নিষেধ করা হচ্ছে। কেউ কর্ণপাত করছে না।

এদিকে,  জমির উপরিভাগ ‘টপ সয়েল’ কেটে নিয়ে ফসলি জমির বিনষ্ট ঠেকিয়ে ফসলের জমি রক্ষায় বিভাগীয় কমিশনার বরাবরে পত্র প্রেরণ করেছে সাতকানিয়ার বাসিন্দা ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) এর কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ডাঃ আমম মিনহাজুর রহমান। গত ৪ এপ্রিল তার স্বাক্ষরিত পত্রটি বিভাগীয় কমশনারের কার্যলয়ে প্রেরণ করেন। এ পত্রে আওয়ামীলীগের এ প্রভাবশালী নেতা বলেন, সাতকানিয়ায় কৃষকের দারিদ্রতা ও অজ্ঞতাকে পুঁজি করে একশ্রেণীর অসাধু মাটি ব্যবসায়ী ও দালালরা নগদ অর্থলোভের ফাঁদে ফেলে স্বল্পমূল্যে আবাদি জমির মাটি ইটভাটায় বিক্রি করছেন। কৃষি জমির মূল্যবান এই মাটি ‘টপ সয়েল’ কেটে নিয়ে গেলেও উপজেলা, থানা ও কৃষি প্রশাসন আশ্চর্যজনকভাবে নীরবতা পালন করে চলেছে। ফসলি জমির টপ সয়েল বিনাশের কারনে সাতকানিয়ায় ফসল উৎপাদন মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়বে। কারণ জমির উপরিভাগের দেড় থেকে ২ ফুট অংশের মধ্যেই মাটির মূল উর্বরা শক্তি বিদ্যমান। এটি কেটে নিয়ে যাওয়ার কারনে জমির উর্বরা শক্তি কমে যায়। এ জমিতে আবারো উর্বরা শক্তি নিয়ে আসতে কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ বছর সময় লেগে যায়। শুধু তাই নয় সাম্প্রতিক সময়ে উপজেলাধীন প্রায় সকল ইউনিয়ন এমনকি পৌর এলাকায় জমি থেকে প্রায় ২০-৩০ ফুট গভীর কূপ খনন করে মাটি সংগ্রহ করা হচ্ছে। এতে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে ভয়াবহ রকম পরিস্থিতি তৈরী হতে পারে। তাছাড়া এই মাঠি চট্টগ্রাম-ককাসবাজার মহাসড়কের উপর দিয়ে পরিবহণ করার ফলে সড়কে এ মাঠি পড়ে গত সপ্তাহে সামান্য বৃষ্টিতে সড়কটি মারাত্মক পিচ্ছিল হয়ে ঝুকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে প্রায় ৪ ঘন্টা। এ বৃষ্টি যদি রাতের বেলায় হতো তাহলে এপিচ্ছিল সড়কে ব্যাপক প্রানহানীর আশংকা উড়িয়ে দেওয়ার কোন সুযোগ ছিলনা। কেননা সড়কটি এমন ভাবে পিচ্ছিল হয়ে যায় যে, সড়ক দিয়ে গাড়ি চালানোর চেষ্টা করা হলেই গাড়ি রাস্তার পাশে পড়ে যাচ্ছিল।

তিনি আরো বলেন, বর্তমানে প্রশাসনের নাকের ডগায় বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌর এলাকায় এস্কেবেটর দিয়ে মাঠি কেটে তা শতাধিক অবৈধ মিনি ট্রাকে করে প্রকাশ্যে বহন করা হলেও জনজীবন অতিষ্ট করে তুললেও সাতকানিয়া প্রশাসন এ ব্যাপারে নীরব ভূমিকা পালন করছে।

অনতিবিলম্বে উপরোল্লিখিত বিষয়ে দ্রুততম সময়ে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে পরিস্থিতির ভয়াবহতা কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যাবে বলে আশংকা করেন তিনি।

বিভাগীয় কমিশনারকে পত্র প্রেরনের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ডা. আমম মিনহাজুর রহমান বলেন, বর্তমানে সাতকানিয়ায় জনসাধারণ চলাচলের অবস্থ নেই। মহাসড়ক এমনকি গ্রামীন সড়ক দিয়েও মাঠির ট্রাক চলাচল করার কারনে জনজীবন অতিষ্ট হয়ে উঠেছে। নষ্ট হচ্ছে গ্রামীন অবকাঠামো। আমি বিষয়টি উল্লেখ করে মাননীয় বিভাগীয় কমশিনার ও জেলা প্রশাসক মোহদয়কে পত্র দিয়েছি। এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আমি উচ্চ আদালতে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইব এবং এ কাজে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য রীট পিটিশন দায়ের করব।

আপনার মতামত দিন...

ক্যালেন্ডার এবং আর্কাইভ

Open

Close