চট্টগ্রাম, , শনিবার, ২১ এপ্রিল ২০১৮

সাতকানিয়ায় পরিবেশের মৃত্যুপরোয়ানা!

প্রকাশ: ২০১৮-০৪-০৫ ১৮:০০:২৬ || আপডেট: ২০১৮-০৪-০৬ ১২:১৮:২৭

সিটিজি টাইমস প্রতিবেদক 

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার অর্ধশত অবৈধ ইটভাটার কালো ধোঁয়ায় দূষিত হচ্ছে সবুজ প্রকৃতি। একই সঙ্গে ইটভাটায় জ্বলছে কাঠ। বাতাসে উড়ছে ইটভাটার ধুলাবালি, কয়লা-কাঠের কালো ধোঁয়া। ইঞ্জিনের আওয়াজে হচ্ছে শব্দদূষণ। স্বাস্থ্যহানি হচ্ছে আশপাশের মানুষের।

এসবের অধিকাংশের বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না নেয়ার পাশাপাশি কেবল অনুমতির আবেদন জমা দিয়েই ইটভাটা স্থাপন করে উৎপাদনে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

প্রশাসনের নাকের ডগায় প্রভাবশালীদের মালিকানায় গড়ে উঠা এসব ইটভাটার দখলে-দূষণে এখন সাতকানিয়ার বিভিন্ন গ্রামের সাধারণ মানুষ নিরুপায়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাত্র ২০ শতাংশ উন্নত প্রযুক্তির বৈধ ইটভাটা নিয়ে চট্টগ্রামে ইট পোড়ানোর মৌসুম শুরু হয়েছে। বাকি ৮০ শতাংশ ইটভাটা অবৈধভাবে ইট পোড়ালেও পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসন কার্যত নীরব রয়েছে। ইটভাটা মালিকরা উচ্চ আদালতে রিট মামলা করে কিংবা পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তাদের কৌশলে ‘ম্যানেজ’ করে ইট পোড়ানো শুরু করেছেন।

যদিও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর অনেক বেশি সক্রিয়ভাবে মাঠে কাজ করছে। তবে অবৈধ ইটভাটায় অভিযান চালাতে গেলে রাজনৈতিক প্রভাবই বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন তাঁরা।

অবৈধ ইটভাটায় ইট পোড়ানোর বিষয়ে জানতে চাইলে সাতকানিয়ার ইটভাটা মালিক সমিতির সধারন সম্পাদক ফরিদ আলম সিটিজি টাইম্‌সকে বলেন, ‘সাতকানিয়ার বেশির ভাগ ইটভাটা ১২০ ফুট উঁচু আছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী ১৪টি ইটভাটা রূপান্তর করা হয়েছে। আগামী বছরের মধ্যে অন্যগুলো হবে বলে আশা করছি।’ নতুন পদ্ধতিতে ইটভাটা রূপান্তরিত করতে সময় প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ইটভাটা প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ অনুযায়ী কৃষিজমিতে বা এর আশপাশে ইটভাটা নির্মাণ নিষিদ্ধ হলেও সৈয়দপুর উপজেলার বাঙ্গালীপুর, বোতলাগাড়ী, কামারপুকুর ইউনিয়নে ফসলি জমি নষ্ট করে গড়ে উঠছে এসব ভাটা। ভাটার বর্জ্যে কৃষিজমির উর্বরতা হ্রাস পেয়ে কমছে উৎপাদন। সেইসঙ্গে নষ্ট হচ্ছে এইসব এলাকার গাছের ফল। ভাটার কালো ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ।

সাতকানিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শোয়েব মহামুদ সিটিজি টাইম্‌সকে বলেন, সাধারণ কৃষকদের অসচেতনতার সুযোগে এক শ্রেণির মাটি ব্যবসায়ীরা কৃষি সম্পদের সর্বনাশ করছে। এ ব্যাপারে মাঠ পরিদর্শন করে শিগগির কৃষকদের বুঝানোর চেষ্টা করা হবে। তিনি আরো বলেন, এ অঞ্চলে উদ্বেগজনকভাবে জমির টপ সয়েল বিক্রি হচ্ছে। টপ সয়েলের ৬ ইঞ্চির ভেতরে মাটিতে পুষ্টি থাকে। ফসল এ পুষ্টি থেকে খাবার পায় এবং বেড়ে উঠে। আর টপ সয়েল কেটে নেওয়ার পর জমি উর্বরতা শক্তি হারাচ্ছে বলে তিনি আরো জানান। কৃষকদের টপ সয়েল বিক্রি করতে নিষেধ করা হচ্ছে। কেউ কর্ণপাত করছে না।

এদিকে এলাকাবাসীর অভিযোগ, গেল কয়েক বছরে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে সাতকানিয়ার বিভিন্ন ফসলিজমিতে গড়ে ওঠেছে ৬০টিরও বেশি ইটভাটা। বিশেষ করে উপজেলার মৌলভীর দোকান থেকে কেরানিহাট পর্যন্ত তিন থেকে চার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এসব ইটভাটার অধিকাংশের অবস্থান।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এসব ইট-ভাটার অনেকগুলোই স্থাপন করা হয়েছে ডজনখানেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গা ঘেঁষে। এতে সাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে জাফর আহমদ চৌধুরী ডিগ্রি কলেজ, রসুলাবাদ সিনিয়র মাদ্রাসা, সৈয়দ মক্কী রা. কিন্ডারগার্টেন, রসুলবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মরফলা আর এম এন উচ্চ বিদ্যালয়সহ অন্তত ডজনখানেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা।

সরেজমিনে সাতকানিয়ার মরফলা, এওচিয়া, কেরাণীহাট ও আশপাশের বেশ কিছু এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ইট পোড়ানো নিয়ন্ত্রণ আইন-২০০১ অনুযায়ী লোকালয়ের তিন মাইল দূরত্বে ইটভাটা স্থাপনের নিয়ম থাকলেও তার কোনো তোয়াক্কা না করেই যত্রতত্র গড়ে উঠেছে ইট-ভাটা। এসব ভাটা স্থাপন করা হয়েছে অসংখ্য পাহাড়, টিলা, বনাঞ্চল আর ফসলি জমি দখলে নিয়ে। নিষিদ্ধ প্রযুক্তির ড্রাম চিমনি ব্যবহার ছাড়াও এসব ইট-ভাটায় পোড়ানো হচ্ছে পার্শ্ববর্তী বনাঞ্চলের কাঠ।

মরফলা আর এম এন উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন জানান, ইট-ভাটার চিমনি থেকে নির্গত কালো ধোঁয়ার প্রভাবে বনাঞ্চলের গাছগুলো যেমন মরতে শুরু করেছে তেমনি ইটপোড়ার ঝাঁজালো গন্ধে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে বসা কষ্টকর হয়ে পড়ে। এতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যাসহ নানা ধরনের রোগ আক্রান্ত হচ্ছে গ্রামবাসী। তিনি আরও জানান, নির্বিচারে পাহাড়ী এলাকার গাছ নিধনের ফলে বন্যপ্রাণিরা বনাঞ্চল ছেড়ে লোকালয়ে হানা দিচ্ছে।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে কেরাণীহাট এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, ফসলি জমির ওপরের অংশ কেটে কেটে ইটভাটাগুলোর জন্য মাটি সংগ্রহ করা হচ্ছে। এজন্য ব্যবহার করা হচ্ছে বড় বড় এক্সকেভেটর। যেসব দিয়ে নিয়মিত মাটি খোঁড়ার ফলে ফসলি জমি বিলীন হয়ে সৃষ্টি হয়েছে ২০/৩০ ফুট গভীর গর্তের। স্থানীয় কৃষকরা জানান, এভাবে মাটি কেটে কেটে জমি ধ্বংস করায় এসবে আর কখনো ফসল ফলানো সম্ভব হবে না। মাটি উত্তোলন ও সংগ্রহ প্রক্রিয়ার কারণে পুরো এলাকায় ধুলোর রাজত্ব তৈরি হওয়ায় আশপাশের গাছপালা বিনষ্ট হয়ে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে ফসলি জমিও। মাটি সংগ্রহের এমন চিত্র দেখা যায় আশপাশের বেশ কয়েকটি গ্রাম ঘুরে।

উপজেলার মরফলা গ্রামের বাসিন্দা ও জাফর আহমদ চৌধুরী ডিগ্রি কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী শাহাদাত হোসেন অভিযোগ করেন, নলুয়া গ্রামের নয়াখালের বাঁধ আর সরকারি খাসের জমি দখল করে কোনো ছাড়পত্র ছাড়াই তাদের এলাকায় গড়ে উঠেছে সোনার বাংলা নামের একটি ইট-ভাটা। এই ইট-ভাটার মালিকরা প্রভাবশালী হওয়ায় এলাকাবাসীর বাঁধার মুখেও তা বন্ধ করা যায়নি।

পরিবেশদূষণ ও সরকারি খাসজমি দখলে নেয়ার অভিযোগ তুলে তা বন্ধের জন্য সম্প্রতি এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে প্রশাসন বরাবর চিঠি দেয়া হলেও তা নিয়ে খুব একটা তৎপরতা দেখা যায়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। তবে পরিবেশ ছাড়পত্রসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে না পারায় গেল সপ্তাহে এ ইট-ভাটাটিকে এক লাখ টাকা জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আসিফ ইমতিয়াজের নেতৃত্বে এ ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান পরিচালিত হয়।

এসময় তিনি এলাকাবাসী ও সাংবাদিকদের সোনার বাংলা নামের ওই ইটভাটার বিরুদ্ধে সরকারি খাস জমি দখলের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের আশ্বাস দেন।

পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, মরফলার নলুয়ার একাংশসহ সাতকানিয়ার তিন কিলোমিটার এলাকাতেই ইটভাটা রয়েছে ৬০টি, যেসবের মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র রয়েছে মাত্র এক-তৃতীয়াংশের।

স্থানীয়রা জানান, অনুমোদন আর নিয়মের তোয়াক্কা না করে এভাবে প্রশাসনের নাকের ডগায় প্রভাবশালীরা এভাবে একের পর একে ইট-ভাটা বানিয়ে যাচ্ছে। ইটভাটা এলাকায় অধিকাংশ গরিব কৃষক হওয়ায় তাদের ধান চাষের পাওয়া মুনাফা থেকেও অধিক মুনাফা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে জমিগুলো অগ্রিম বন্ধকের মতো করে চুক্তিতে নেওয়া হয়।

এছাড়াও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাটায় একটু বেশি বেতনে তাদের কাজের ব্যবস্থা করে দেন ভাটা মালিকরা। এতে প্রলুব্ধ হয়ে জমি দিতে বাধ্য হয় অনেক কৃষক ও স্থানীয় বাসিন্দা। অন্যদিকে সাতকানিয়ার সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গা-ঘেঁষে ভাটা গড়ে ওঠার একমাত্র কারণ সরকারি বন বিটের সংরক্ষকদের হাত করে অবৈধ কাঠ পোড়ানোর সুযোগ হাতিয়ে নেয়া। এই সুযোগটি কাজে লাগাতেই স্বল্প দূরত্বে বনের কাঠ আহরণের সুবিধামতো স্থানে গড়ে উঠছে একের পর এক ইটভাটা।

এতসব অনিয়মের বিরুদ্ধে সুফল মিলছে না বলে অভিযোগ করেন নলুয়া গ্রামের বাসিন্দারা।

সাতকানিয়ায উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ মোবারক হোসেন সিটিজি টাইম্‌সকে বলেন, অভিযোগ পেলেই সাথে সাথে তারা অভিযানে বেরিয়ে পড়েন নয়তো স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহায়তা নিয়ে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে ব্যবস্থা নেন। অনুমোদনহীন ইটভাটা ও দখল-দূষণ ঠেকাতে এখন থেকে অভিযান আরো জোরদার করা হবেও বলেও আশ্বাস দেন তিনি।

আপনার মতামত দিন...

আপনার মতামত দিন...

ক্যালেন্ডার এবং আর্কাইভ

Open

Close