চট্টগ্রাম, , রোববার, ২২ এপ্রিল ২০১৮

অদক্ষ চালক দিয়ে চলছে ‘সেইভ লাইন’ একের পর এক ঘটছে দুর্ঘটনা, নির্বিকার প্রশাসন

প্রকাশ: ২০১৮-০৪-০৬ ১১:৫৮:১১ || আপডেট: ২০১৮-০৪-০৬ ২১:৪৪:০৭

এম মাঈন উদ্দিন
মিরসরাই প্রতিনিধি

আবুতোরাব প্রফেসর কামাল উদ্দিন চৌধুরী কলেজের অধ্যক্ষ আমিনুর রসুল দুপুর ১২টার দিকে নিজ কলেজ থেকে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়া নিজের ছাত্র-ছাত্রীদের দেখতে বের হন। গন্তব্য উপজেলার নিজামপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ। বড়তাকিয়া থেকে ‘সেইভ লাইন’ পরিবহনের একটি গাড়িতে উঠেন তিনি। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নয়দুয়ারিয়া এলাকায় যাওয়ার পর মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে নিজামপুর কলেজে নয় যেতে হয়েছে না ফেরার দেশে। তিনি শিক্ষার্থীদের দেখতে আর যেতে পারেননি, উল্টো শিক্ষার্থীরা তার নিথর দেহ দেখতে ছুটে গেছেন হাসপাতালে। মহুর্তের মধ্যে একটি তরতাজা জীবন্ত মানুষ চলে গেলেন ভাবতেই অবাক লাগছে। গত ২ এপ্রিল উপজেলার নয়দুয়ারিয়া এলাকায় এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। শুধু ওইদিন নয়, এভাবে সড়কের কোথাও না কোথাও সেইভ লাইন, লেগুনার কারণে দুর্ঘটনা ঘটে চলছে।

জানা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মিরসরাইয়ে যোগাযোগের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক যানবাহন হিসেবে গত কয়েক বছর যাবৎ ব্যবহার হয়ে আসছে লেগুনা (সেইভ লাইন)। মহাসড়কে সিএনজি-অটোরিক্সা বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকে সেইভ লাইন গাড়িগুলোর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। শুরুতে সড়ক দুর্ঘটনা না ঘটলেও কিছুদিন যেতে না যেতে মহাসড়কে পুনরায় শুরু হয় মৃত্যুর মিছিল। ২০১৭ সালে ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের মিরসরাই উপজেলা অংশে মোট ২৭ টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এতে নিহত হয় ২৬ জন। আহত হয়েছে ২৩ জন। সর্বশেষ গত ২ এপ্রিল মহাসড়কের নয়দুয়ার এলাকায় একটি কার্ভাডভ্যানের ধাক্কায় সেইভ লাইনে থাকা প্রফেসর কামাল উদ্দিন চৌধুরী কলেজের অধ্যক্ষ আমিনুর রসুল নিহত হন। পরদিন বড়তাকিয়া এলাকায় আরেকটি সেইভ লাইন দুর্ঘটনার কবলে পড়ে গুরুত্বর আহত হয় ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তা মুহাম্মদ ইব্রাহিম।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হলো অনভিজ্ঞ চালক, হেলফারবিহীন গাড়ী, যত্রতত্র স্টফেজ, মহাসড়কের পাশে ছোট গাড়ীর জন্য আলাদা লেইন না থাকা। মহাসড়কে সিএনজি অটোরিক্সা বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকে অটোরিক্সা চালকরা কোন রকম প্রশিক্ষণ ছাড়া সেইভ লাইন চালাতে শুরু করেন। প্রতিটি সেইভ লাইন গাড়িতে ১৩-১৫ জন যাত্রী বসা যায়। চালকরা গাড়ী চালানোর পাশাপাশি যাত্রী উঠানামা, ভাড়া সংগ্রহও করে থাকেন। এতে চালকরা যাত্রী উঠানামার দিকে বেশী মনোযোগী থাকে বিধায় ওভার টেক কিংবা পেছনের দিক থেকে আসা গাড়ীর প্রতি তাদের তেমন মনোযোগ থাকেনা। এতে করে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে গেছে। তাছাড়া মহাসড়কে আঞ্চলিক যাত্রীবাহী গাড়ীর জন্য আলাদা কোন লাইন না থাকাতে সেইভ লাইন সহ যাত্রীবাহী গাড়ীগুলো সড়কের উপর দাঁড়িয়ে যাত্রী উঠানামা করার কারণে পেছনের দিক থেকে আসা দ্রুত গতির গাড়ীর ধাক্কায় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত।

মহাসড়কে দায়িত্বরত হাইওয়ে পুলিশ, গাড়ির ভুক্তভোগী যাত্রী ও দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে এখানে দুর্ঘটনার নেপথ্যে বেশ কিছু কারণের কথা জানা গেছে। কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো ট্রাফিক আইন অমান্য করে গাড়ি চালানো। এছাড়া ঘুমচোখে গাড়ি চালানো, চালকদের নিজেদের মধ্যে আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতা, ঝুঁকিপূর্ণ ড্রাইভিং, উল্টোপথে গাড়ি চালানো, সংযোগ সড়ক থেকে দ্রুতগতিতে মহাসড়কে উঠা, অদক্ষ চালক (অধিকাংশ ক্ষেত্রে সহকারী হাতে গাড়ি থাকা) কর্তৃক গাড়ি চালনায় বারবার দুর্ঘটনা ঘটছে।

অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, মহাসড়কে প্রায় ৪ হাজার সিএনজি অটোরিক্সা চলাচল করতো। সিএনজিগুলো বন্ধ হলেও সেই চালকরা এখন সেইভ লাইনে চালকের আসনে বসছে। তাদের লাইসেন্স তো দুরের কথা নূনতম অভিজ্ঞতা নেই বললে চলে।

দুর্ঘটনা রোধে সিএনজি অটোরিক্সা তুলে দেওয়ার পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিলো মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল কমে আসবে। প্রকৃতপক্ষে কমার চেয়ে মৃত্যুর এ মিছিল আরো দীর্ঘতর হচ্ছে। ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কে প্রতিনিয়ত যে দুর্ঘটনা ঘটছে তার সিংহভাগই সেইভ লাইন সার্ভিসের হিউম্যান হলার গাড়ী গুলোতে।

মিরসরাই উপজেলার জোরারগঞ্জ হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ সার্জেন্ট সোহেল সরকার জানান, ২০১৭ সালে ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের মিরসরাই উপজেলা অংশে মোট ২৭ টি সড়ক দূর্ঘটনা ঘটে। এতে নিহত হয় ২৬ জন। আহত হয়েছে ২৩ জন। এসব দূর্ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে ১৯ টি। ২০১৮ সালে সড়ক দূর্ঘটনা ঘটেছে ৬ টি। নিহত হয়েছে ৬ জন। আহত হয়েছে ১ জন। মামলা হয়েছে ৩ টি । ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকায় মামলা দায়ের করা হয়েছে ২১৫ টি।

হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী যে দূর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে তার অধিকাংশই ঘটেছে সেইভ লাইন সার্ভিসের গাড়ী গুলোতে।

সামাজিক সংগঠন নির্বাণ সংঘের সভাপতি তানভীর হোসেন জানান, সেইফ লাইন সার্ভিসের গাড়ী গুলো অদক্ষ ড্রাইভার দ্বারা পরিচারিত হয়। ফলে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে। এসব অদক্ষ ও লাইসেন্স বিহীন ড্রাইভারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া হলে মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল থামানো যাবে না।

মিরসরাই লতিফীয়া কামিল মাদরাসার কামিল শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ বলেন, আমরা বাধ্য হয়ে সেইভ লাইন সার্ভিসে উঠি। প্রথম দিকে এসব গাড়ীর হেলপার থাকলেও এখন একজন ড্রাইভার গাড়ী চালানো এবং ভাড়া নিয়ে থাকেন। এসব ড্রাইভারদের বয়স ১৮ বছরের নিচে। অনেকের নেই বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স। ফলে মৃত্যু ঝুকি নিয়ে আমাদের প্রতিনিয়ত এসব গাড়ীতে যাতায়াত করতে হয়।

জানা গেছে, বারইয়ারহাট থেকে সীতাকুন্ড রুটে ৩৫০টি হিউম্যান হলার গাড়ি রয়েছে। প্রতিদিন এসব গাড়ি থেকে ৩শ টাকা করে জিবি (লাইন ফি) নেয়া হয়। মালিক সমিতি এই টাকা নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গড়ে ৩শ গাড়ি চলাচল করলেও ৯০ হাজার টাকা দৈনিক ফি নেয় তারা। কিন্তু লাইনে নির্দিষ্ট কোন নিয়ম কানুন নেই। চালকরা যেখানে সেখানে গাড়ি ঘুরিয়ে দেয়। এতে করে যাত্রীদের কষ্ট করতে হয়।

নাম প্রকাশে অনচ্ছিুক একাধিক চালক বলেন, প্রতি গাড়ি থেকে ৩শ টাকা করে জিবি নেয়া হলেও চালকের কল্যানে কোন ফান্ড নেই। মালিক সমিতি, বারইয়ারহাট, বড়দারোগাহাট ও সীতাকুন্ডের কিছু রাজনৈতিক নেতা, হাইওয়ে এবং থানা পুলিশ মাসিক চাঁদা পায়।

বারইয়ারহাট থেকে চট্টগ্রামের সিটি গেইট পর্যন্ত চলাচলকারী হিউম্যান হলার গাড়ী গুলোর মালিক সংগঠন চট্টগ্রাম জেলা হিউম্যান হলার মালিক সমিতির সভাপতি রফিক উদ্দিন এসব বিষয় অস্বীকার করে করেন। অদক্ষ ও ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ী চালনা প্রতিরোধ করতে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকবার গাড়ীর মালিকদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। আমরা আবারও মালিকদের সাথে বসে শীঘ্রই সীদ্ধান্ত গ্রহণ করবো।

আপনার মতামত দিন...

আপনার মতামত দিন...

ক্যালেন্ডার এবং আর্কাইভ

Open

Close