চট্টগ্রাম, , রোববার, ২২ এপ্রিল ২০১৮

উচ্চশিক্ষিত সুন্দরী জঙ্গি টার্গেটে!

প্রকাশ: ২০১৮-০৪-০৮ ১১:১৪:৪০ || আপডেট: ২০১৮-০৪-০৮ ১৬:১৯:০৮

নারী জঙ্গিরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠছেন। বিশেষ করে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়া বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া নারীরাই এখন পুরুষ জঙ্গিদের বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছেন। বিষয়টি এ কারণে ভাবনায় ফেলে দিয়েছে সংশ্লিষ্ট সব বাহিনীকে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, অব্যাহত জঙ্গিবিরোধী অভিযানে কোণঠাসা হয়ে কৌশল পরিবর্তন করেছে জঙ্গি সংগঠনগুলো। এ সময়ে নব্য জেএমবিসহ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের পুরুষ কর্মীদের অধিকাংশই কারাগারে রয়েছেন। বাকি যারা এখনো অধরা তারা দেশে-বিদেশে ‘হিজরত’ করছেন বা পালিয়ে আছেন। কিন্তু সাংগঠনিক কার্যক্রম সক্রিয় রাখতে কাজে লাগাচ্ছেন নারী জঙ্গিদের। ইতোমধ্যে নারী জঙ্গিরা দেশে ও দেশের বাইরে বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন বলে অনুমান করা হচ্ছে। দু-এক বছরে বিভিন্ন জঙ্গি আস্তানা এবং গোপন বৈঠক একাধিক নারী জঙ্গি আটকের পর ধারণা করা হচ্ছিল, পুরুষ জঙ্গিরা তাদের পরিবারের নারী সদস্যদের জঙ্গি তৎপরতায় জড়াতে বাধ্য করছেন। তবে গত বৃহস্পতিবার নব্য জেএমবির নারী শাখা ‘ব্যাট ওমেন’-এর প্রধান হোমায়রা ওরফে নাবিলা এবং তার আগের দিন গত বুধবার জঙ্গি তামিম গ্রুপের সদস্য রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সাদিয়া আফরোজকে গ্রেপ্তারের পর বিষয়টি নতুন করে ভাবাচ্ছে অনেককে।

নাবিলা ও সাদিয়া এরা কারা?
নাবিলা গত বছর জাতীয় শোক দিবস ১৫ আগস্টে রাজধানীর পান্থপথে হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনালের জঙ্গি হামলার পরিকল্পনায় জড়িত ছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম। নব্য জেএমবিপ্রধান হোমায়রা ওরফে নাবিলা ধনাঢ্য ব্যক্তির সন্তান। তিনি জঙ্গি কর্মকাণ্ডের জন্য অর্থায়নে সহযোগিতা করতেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। গত বছর ওলিওতে হামলার ঘটনায় যুক্ত করিম ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি প্রকাশনা সংস্থার কর্ণধার তানভীর ইয়াসিন করিমকে গ্রেপ্তার করা হয় ২০ নভেম্বর। গত বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তার হওয়া হোমায়রা ওরফে নাবিলা হলেন সেই তানভীরের স্ত্রী। পুলিশ বলছে, হোমায়রাই তানভীরকে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করেন এবং আকরাম হোসেন খান নিলয়ের মাধ্যমে জঙ্গি কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন করেন। সেই আকরামও এখন পুলিশের জিম্মায়। পুলিশ জানিয়েছে, ওই ঘটনায় হোমায়রা ওরফে নাবিলার সম্পৃক্ততার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর কিছু দিন ধরে তাকে নজরবন্দি করে রাখা হয়েছিল। অন্তঃসত্ত্বা থাকায় তাকে পুলিশ এত দিন গ্রেপ্তার করেনি। হোমায়রা রাজধানীর নামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরে নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ও মালয়েশিয়ায় পড়ালেখা করেছেন। হোমায়রার বাবা রাজধানীর হাতিরপুলে একটি বিলাসবহুল শপিংমলের মালিক।

অন্যদিকে জঙ্গি তামিম গ্রুপের সক্রিয় কর্মী বেরোবির ছাত্রী সাদিয়া ছিলেন নারী জঙ্গি নেটওয়ার্কের সক্রিয় সদস্য।
সাদিয়া আফরোজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী। তার গ্রামের বাড়ি লালমনিরহাট জেলার হাতিবান্ধার ধূনবী গ্রামে। সাদিয়ার বাবার নাম নুরল ইসলাম।

পুলিশ সাদিয়ার কাছ থেকে তিনটি মোবাইল ফোন সেট উদ্ধার করে, যেগুলোতে বিভিন্ন দেশের মুসলিমদের হত্যা ও জখমের ছবি, আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের নিয়মকানুন ও বিভিন্ন জঙ্গি নেতাদের ছবি ও তাদের বক্তব্যের ফুটেজ পাওয়া গেছে।

পুলিশ জানিয়েছে, বেশ কয়েকটি অ্যাপস ব্যবহার করে ওইসব ছবি ও ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে তিনি জঙ্গি সদস্যদের উদ্বুদ্ধ করতেন এবং দেশের অভ্যন্তরে নাশকতা চালানোর পরিকল্পনা করছিলেন। অনুসন্ধানে পুলিশ জেনেছে, ২০১৫ সাল থেকে ফেসবুকে নিজ নামে মোট তিনটি আইডি খোলেন সাদিয়া আফরোজ নিনা। এসব আইডির মাধ্যমে মোহাম্মদ আনাস, মেহেদী হাসান, এমআরএফ ওরফে সোহেল রানাসহ ১০-১২ জন জঙ্গি সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করে নাশকতা পরিকল্পনা করতেন তিনি।

টার্গেট শিক্ষিত, সুন্দরী ও ধনাঢ্য নারীরা
প্রথম দিকে পুরুষ জঙ্গিরা তাদের স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবারের নারী সদস্যদের রিক্রুট করলেও এখন সবচেয়ে বেশি নজর দিয়েছে দেশের সরকারি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ‘সুন্দরী’ ও ‘স্মার্ট’ নারীদের ওপর। ফেসবুকসহ নানা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে নানা কায়দায় ‘সুন্দরী’ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীদের টার্গেট করে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। পাতা ফাঁদে পা দিয়ে অনেকেই জড়িয়ে পড়ছেন জঙ্গিবাদে।

এসব উচ্চশিক্ষিত সুন্দরী নারী জঙ্গি সদস্য সংগ্রহ, অর্থ সংগ্রহ, তথ্য আদানপ্রদানসহ নানা কাজ করছেন অবাধে। সাধারণত যে কোনো অপকর্মের ক্ষেত্রে নারী ও শিশুকে সন্দেহের বাইরে রাখা হয়। তা ছাড়া কোনো নারীকে সন্দেহ হলে হুট করেই তাকে আটক করা যায় না। এ জন্য পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণের প্রয়োজন পড়ে। জঙ্গিরা মূলত, এ সুযোগটিই কাজে লাগাচ্ছে।

কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও জঙ্গিরা বিশেষ করে টার্গেট করেছেন দেশের বেসরকারি নর্থসাউথ, ব্র্যাক ও মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়কে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করা উচ্চবিত্ত পরিবারের মেধাবী, সুন্দরী ও আধুনিক পোশাক পরিচ্ছদধারী ছাত্রীদের বেছে বেছে জঙ্গি গ্রুপে ভেড়াচ্ছে কয়েকটি জঙ্গি গ্রুপ। বেশ কয়েকটি বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী গ্রেপ্তারের পর এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে। তারা জানিয়েছে, সুন্দরী, স্মার্ট ও মেধাবী মেয়েদের টার্গেট করার কারণ হয়েছে, এদের দিয়ে সহজেই জঙ্গি সদস্য সংগ্রহ, তথ্য আদানপ্রদান, চাঁদা আদায়সহ নানা সাংগঠনিক তৎপরতা চালানো যায়। অনলাইন বিশেষ করে ফেসবুকে বিভিন্ন গ্রুপ ও আইডির মাধ্যমে সুন্দরী জঙ্গি রিক্রুট কার্যক্রম চলে। প্রথমে বন্ধুত্ব, এরপর নানা ভিডিও লিংক শেয়ার, তাতে লাইক কমেন্টের ধরন দেখে তারা টার্গেট করত নারী শিক্ষার্থীদের। আবার সুন্দরী এ নারী জঙ্গিরাই অনলাইনে তরুণ পুরুষ জঙ্গিদের নানাভাবে ‘জিহাদে’ উদ্বুদ্ধ করে জঙ্গি দলে ভেড়ান।

২০১৬ সালের ২১ জুলাই জেএমবির দক্ষিণাঞ্চলের আমির মো. মাহমুদুল হাসান ওরফে হাসানকে (২৭) গাজীপুরের টঙ্গী এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। হাসান র‌্যাবরে কাছে স্বীকার করেছেন, নব্য জেএমবির টার্গেট উচ্চশিক্ষিত মেধাবী উচ্চবিত্ত পরিবারের সুন্দরী মেধাবী শিক্ষার্থীরা। কারণ, নারীদের দলে ভেড়ানো সম্ভব হলে, ওই নারীদের মাধ্যমে ফাঁদে ফেলে নানা কৌশলে ছেলেদের দলে ভেড়ানো সহজ হয়। তিনি জানান, নব্য জেএমবিতে উচ্চশিক্ষিত নারীরা কাজ করছেন। সুন্দরী নারীদের কারণেই তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম আগের চাইতে বেশি বিস্তৃত হয়েছে। তা ছাড়া নারীদের মাধ্যমে সহজেই বেশি ফান্ড গঠন করা সম্ভব হয়। ওইসব নারীরাও নিয়মিত চাঁদা দিয়ে থাকেন। নারীরা চাঁদা আদায়ের পাশাপাশি তথ্য আদানপ্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাদের দিয়ে তথ্য আদানপ্রদান করার ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ এড়ানো অনেকটাই সহজ হয়।

হাসানের দেওয়া তথ্য মতে, ওই বছর ১৫ আগস্ট গ্রেপ্তার হন নব্য জেএমবির নারী নেত্রী মানারাত ইন্টারন্যাশনাল বিশ^বিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগে চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী আকলিমা বেগম, একই বিভাগের অনার্সের শেষ বর্ষের সপ্তম সেমিস্টারের ছাত্রী মৌ ও একই বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী মেঘনা এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজের ইন্টার্ন চিকিৎসক ঐশী। ঐশীর বাবা ডা. বিশ্বাস আকতার হোসেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং মা ডা. নাসিমা সুলতানা ডা. সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের গাইনি বিভাগে কর্মরত।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে জঙ্গি সংগঠনগুলোর তৎপরতা কম। এর অন্যতম কারণ এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশই নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। তাদের টার্গেট বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং উচ্চবিত্ত ঘরের সন্তান। এতে কর্মী ও অর্থ সংগ্রহ দুটিই নিশ্চিত হওয়া যায়।

জঙ্গিবাদে নারীদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি) অপারেশন্স কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান বলেন, ‘জঙ্গি নারী-পুরুষ যেই হোক না কেন, তাদের কোনো ছাড় নয়। জঙ্গির বিষয়ে আমাদের কড়া নজরদারি রয়েছে। বিভিন্ন সময় জঙ্গিরা নানান কৌশল প্রয়োগ করে। এ ক্ষেত্রে তারা তরুণ বয়সী নারীদের বেশি টার্গেট করে থাকে, এটিও তাদের অন্যতম কৌশল। একাধিকবার নারী জঙ্গি সদস্য গ্রেপ্তার করার রেকর্ড আমাদের রয়েছে। তবে জঙ্গিরা যতই কৌশল করুক না কেন আমাদের তৎপরতায় তা ভেস্তে যায়। আমরা এসব বিষয়ে সজাগ রয়েছি। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কোনোটি আমাদের গোয়েন্দা নজরদারির বাইরে নয়। – খোলা কাগজ

আপনার মতামত দিন...

আপনার মতামত দিন...

ক্যালেন্ডার এবং আর্কাইভ

Open

Close