চট্টগ্রাম, , সোমবার, ২৩ এপ্রিল ২০১৮

পবিত্র শব-ই মেরাজ শনিবার

প্রকাশ: ২০১৮-০৪-১৩ ২২:৩৭:৩৭ || আপডেট: ২০১৮-০৪-১৪ ১০:৫১:৪২

পবিত্র শব-ই মেরাজ শনিবার। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুওয়াত লাভের একাদশ বর্ষের রজব মাসের ২৭ তারিখ রাতে মহান আল্লাহর বিশেষ মেহমান হিসেবে আরশে আজিমে আরোহণ করেন। অবলোকন করেন সৃষ্টি জগতের অপার রহস্য।

রাসূল (সা.) উম্মতের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে উপহার হিসেবে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের হুকুম নিয়ে আসেন, যে নামাজ মু’মিনের মেরাজস্বরূপ।

এমন নানা কারণে এ রাত অতি পবিত্র ও মহান আল্লাহর অফুরন্ত রহমত-বরকতে সমৃদ্ধ। দিনটিকে মুসলিম উম্মাহর বিশেষ দিন হিসেবে পালন করা হয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত, রোজা রাখা, নফল নামাজ আদায়ের মধ্য দিয়ে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা শবে মেরাজ পালন করবেন।

যা ঘটেছিল মেরাজের রাতে

জগতের ইতিহাসে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা ‘মেরাজ’। এর আভিধানিক অর্থ সিঁড়ি, সোপান, ঊর্ধ্বগমন, বাহন, আরোহণ, উত্থান প্রভৃতি। অন্য অর্থে ঊর্ধ্বলোকে আরোহণ বা মহামিলন। যা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিশেষ মুজিজা এবং আল্লাহ তাআলার কুদরতের একটি অপার নিদর্শন। নবীকুলের মধ্যে একমাত্র বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে এ অনন্য মর্যাদা প্রদান করা হয়। যাতে তিনি মহান সৃষ্টিকর্তার ঊর্ধ্বজগতের নিদর্শনাবলি ও তাঁর নিয়ামতরাজি স্বচক্ষে অবলোকন করে উম্মতকে তা সবিস্তারে বর্ণনা করতে পারেন।

মহানবী (সা.)-এর ঊর্ধ্বলোকে সফর সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘পবিত্র ও মহিমান্বিত তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে এক রজনীতে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায় পরিভ্রমণ করিয়েছিলেন, যার চারপাশ আমি বরকতময় করেছিলাম তাকে আমার নিদর্শন পরিদর্শন করার জন্য, নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’ (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ১)হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ৫০ বছর বয়সে নবুওয়াতের দশম বর্ষে রজব মাসের ২৬ তারিখ দিবাগত রজনীতে মিরাজের বিস্ময়কর ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। ওই রাত্রিতে তিনি কাবা শরিফের চত্বরে (হাতিমে) অথবা কারও মতে, উম্মে হানীর ঘরে শায়িত ও নিদ্রিত ছিলেন।

এমন সময় ফেরেশতা জিব্রাইল (আ.) সেখানে এসে তাঁকে ঘুম থেকে জাগালেন, ওজু করালেন, সিনা চাক করলেন এবং ‘বোরাকে’ চড়িয়ে মুহূর্তের মধ্যে বায়তুল মোকাদ্দাস পৌঁছালেন। সেখানে হজরত মুহাম্মদ (সা.) ‘ইমামুল মুরসালিন’ হিসেবে তাঁর ইমামতিতে সমস্ত নবী-রাসুলকে সঙ্গে নিয়ে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করলেন।

এরপর তিনি আবার ‘বোরাকে’ চড়ে মহাকাশ পরিভ্রমণ করলেন এবং সপ্তম আকাশে তাঁর সঙ্গে হজরত আদম (আ.), হজরত ঈসা (আ.), হজরত ইয়াহ্ইয়া (আ.), হজরত ইউসুফ (আ.), হজরত ইদ্রিস (আ.), হজরত হারুন (আ.), হজরত মূসা (আ.) ও হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সঙ্গে দেখা-সাক্ষাত্ ও সালাম বিনিময় হলো। নবীদের সংবর্ধনা শেষে সেখান থেকে সপ্তম আকাশের ওপর ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ নামক স্থানে পৌঁছালেন, যেখানে জিব্রাইল (আ.) থেমে গেলেন।

এরপর নবী করিম (সা.) একাকী ‘রফরফে’ চড়ে ‘বায়তুল মামুরে’ উপনীত হয়ে আরশে মুয়াল্লায় আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হন। এখানে তিনি শুধু একটি পর্দার অন্তরাল থেকে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করেন এবং প্রভুর সঙ্গে একান্ত আলাপে মিলিত হন। আশেক ও মাশুকের মধ্যে কথোপকথন হলো।

আল্লাহ তাআলা তাঁকে সমগ্র সৃষ্টিরহস্য বুঝিয়ে দিলেন এবং বেহেশত-দোজখ দেখিয়ে দিলেন, যাতে এ সম্বন্ধে কথা বলতে তাঁর মনে কোনো সন্দেহের উদ্রেক না হয়। সবশেষে তিনি সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের বিধান নিয়ে আবার বোরাকে আরোহণ করে মুহূর্তের মধ্যে ধরণির বুকে ফিরে এলেন। সংক্ষেপে এই হলো মেরাজের প্রকৃত ঘটনা।

এ মর্মে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘অতঃপর সে [মুহাম্মদ (সা.)] তাঁর নিকটবর্তী হলো, অতি নিকটবর্তী; ফলে তাদের মধ্যে দুই ধনুকের ব্যবধান রইল অথবা তারও কম। তখন আল্লাহ তাঁর বান্দার প্রতি যা কিছু প্রকাশ করার ছিল, তা প্রকাশ করলেন।…সে তাকে (জিব্রাইলকে) আরেকবার দেখেছিল সিদরাতুল মুনতাহার কাছে, যার সন্নিকটে রয়েছে জান্নাতুল মাওয়া। যখন বৃক্ষটি যা দ্বারা আচ্ছাদিত হওয়ার তা দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল। এ সময় তার দৃষ্টি বিভ্রম হয়নি এবং লক্ষ্যচ্যুতও হয়নি। নিশ্চয়ই সে তার প্রতিপালকের মহানিদর্শনাবলি স্বচক্ষে অবলোকন করেছিল।’ (সূরা আন-নাজম, আয়াত: ৮-১৮)

শবে মেরাজ বা লাইলাতুল মিরাজের প্রকৃতি এতই অস্বাভাবিক যে সাধারণ মানুষের এটা বুঝে আসে না বা জ্ঞানে ধরে না। কিন্তু ঘটনাটি ঘটেছে এবং আরও অনেক অলৌকিক ঘটনার প্রমাণ পবিত্র কোরআন ও হাদিসে রয়েছে, যেমন হজরত মূসা (আ.)-এর সদলবলে হেঁটে নীল নদ পার হওয়া, হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর নমরুদের বিশাল অগ্নিকুণ্ড থেকে রক্ষা পাওয়া, হজরত ঈসা (আ.)-এর আকাশে আরোহণ এবং পুনরায় দুনিয়াতে আগমন হবে, বিবি মরিয়মের স্বামী ব্যতীত পুত্রসন্তান লাভ এবং হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মেরাজ ভ্রমণ—এসবই বিস্ময়কর ঘটনা। আল্লাহ তাআলা এক বিশেষ উদ্দেশ্যে অর্থাত্ সৃষ্টিরহস্য ও বেহেশত-দোজখ সামনাসামনি দেখিয়ে দেওয়ার জন্য তাঁর প্রিয় হাবিবকে নিজের সান্নিধ্যে তুলে নিয়েছিলেন, যাতে তিনি প্রবল আত্মবিশ্বাস নিয়ে ইসলাম প্রচার করতে পারেন।

শবে মেরাজের উপহার সম্পর্কে বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ আছে যে মেরাজের রাতে নবী করিম (সা.) ও তাঁর উম্মতের জন্য কয়েকটি জিনিস দান করা হয়—প্রথমত: পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ; যা প্রথমে ৫০ ওয়াক্ত ছিল। দ্বিতীয়ত: তাঁর উম্মতের যেসব ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কারও শরিক করবে না, আল্লাহ তার পাপগুলো ক্ষমা করে দেবেন। তৃতীয়ত: সূরা আল-বাকারার শেষ অংশ। চতুর্থত: সূরা বনি ইসরাইলের ১৪ দফা নির্দেশ। যথা- ১. একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করা, তাঁর সঙ্গে কারও শরিক না করা, ২. পিতামাতার সঙ্গে সদাচরণ করা, ৩. আত্মীয়স্বজন, এতিম ও মুসাফিরের হক মেনে চলা, ৪. অপচয় না করা, ৫. অভাবগ্রস্ত ও প্রার্থীকে বঞ্চিত না করা, ৬. হাতকে গুটিয়ে না রেখে সব সময় কিছু দান করা, ৭. অন্যায়ভাবে কোনো মানুষকে হত্যা না করা, ৮. দারিদ্র্যের ভয়ে সন্তান হত্যা না করা, ৯. ব্যভিচারের নিকটবর্তীও না হওয়া, ১০. এতিমের সম্পদের ধারে-কাছেও না যাওয়া, ১১. যে বিষয়ে জ্ঞান নেই তা অনুসন্ধান করা, ১২. মেপে দেওয়ার সময় সঠিক ওজন পরিমাপ করা, ১৩. প্রতিশ্রুতি পালন করা, ১৪. পৃথিবীতে দম্ভভরে চলাফেরা না করা। এসব দিকনির্দেশনা মেনে চললে ইহকালীন ও পারলৌকিক জীবনে অবশ্যই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা যাবে।

নবী করিম (সা.)-এর মেরাজের প্রকৃতি ও অনুপম শিক্ষা বিভিন্ন দিক দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্ববহ ও তাত্পর্যপূর্ণ। যদি মুসলমানদের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শ ও মিরাজের শিক্ষামূলক অধ্যাদেশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি আদর্শ ও কল্যাণমুখী জাতি গঠনের রূপরেখা অনুযায়ী নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নয়নমুখী কাজ করা যায়, তাহলেই বিশ্বমানবতার সর্বাঙ্গীণ সুখ-শান্তি, সমৃদ্ধি ও মুক্তি সম্ভব হবে।

আপনার মতামত দিন...

ক্যালেন্ডার এবং আর্কাইভ

Open

Close