চট্টগ্রাম, , শুক্রবার, ২০ এপ্রিল ২০১৮

ক্রেতা ঠকানোর বাজার বহদ্দারহাট!

প্রকাশ: ২০১৮-০৪-১৬ ১০:৪১:০২ || আপডেট: ২০১৮-০৪-১৬ ২১:৪৮:৫৫

চট্টগ্রাম নগরের অন্যতম প্রধান কাঁচা বাজার বহদ্দারহাট। এখানে মাছ, মাংস ও সবজির দোকান রয়েছে চার শতাধিক। মুদির দোকান আছে আরো অর্ধ শতাধিক। সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণাধীন এ বাজারের ইজারামূল্য প্রতিবছর বাড়লেও বাড়ে না ক্রেতার সুযোগ-সুবিধা। আর ক্রেতা সাধারণকে ঠকানোর অভিযোগ অনেক পুরনো। বিশেষ করে মাংসের দোকানে ক্রেতারা ঠকছেন প্রতিনিয়ত।

একটি এতিমখানায় এক বেলা খাবার দেবেন বোয়ালখালী উপজেলার সৈয়দ নগরের বাসিন্দা ছগির আহমদ। তাই মাংস কিনতে এসেছিলেন চট্টগ্রাম নগরের বহদ্দারহাট। পেশায় কৃষিশ্রমিক ছগির বহদ্দারহাটে বাজারের প্রবেশমুখে এক মাংস বিক্রেতার কাছে তাঁর মাংস কেনার উদ্দেশ্য ও আগ্রহের কথা জানালেন। হাড় ছাড়া খাঁটি মাংস প্রয়োজন তাঁর। বিক্রেতাও ছগিরকে আশ্বস্ত করলেন তাঁর পছন্দমতো মাংস সরবরাহের। জাহাঙ্গীর নামের ওই মাংস বিক্রেতার মিষ্টি কথায় ছগির আহমদ অন্য দোকানে না গিয়ে তাঁর কাছ থেকে আট কেজি মাংস কিনে নেন। সঙ্গে বিক্রেতা মাজারের এতিমখানার জন্য নিজের তরফ থেকে আরো বেশ কিছু বাড়তি মাংস থলেতে তুলে দিলেন। ওজন দিয়ে দেখান মোট মাংস ১১ কেজি। নিজের কেনা ও মাংস বিক্রেতার দেওয়া তিন কেজিসহ ১১ কেজি মাংস নিয়ে মনের খুশিতে বাড়ি চলে যান ছগির। বাড়ি গিয়ে তাঁর মাথায় হাত! মাংসের সঙ্গে হাড় ফুসফুসসহ অনেক কিছু। বাড়ির পাশের এক দোকানে গিয়ে মাংস মেপে দেখেন ওজন আট কেজি। এর মধ্যে নিরেট মাংস মাত্র চার কেজি। ছগির আহমদ তত্ক্ষণাৎ আবারও মাংসের সেই থলে নিয়ে বহদ্দারহাটে ওই মাংস বিক্রেতার কাছে এলেন। রাত তখন ৯টা পার হয়ে গেছে। মাংস বিক্রেতা দোকান বন্ধ করে চলে গেছেন। কোনো বিচার পেলেন না ছগির।

এটি নগরের অন্যতম প্রধান কাঁচা বাজার বহদ্দারহাটের নিত্যদিনের ক্রেতা ঠকানোর শত ঘটনার একটি।

বিশাল এ কাঁচা বাজারে মাংস, মুরগি, মাছ ও সবজির দোকান মিলিয়ে চার শতাধিক দোকান রয়েছে। এছাড়া মুদির দোকান আছে অর্ধশতাধিক। এছাড়া বহদ্দারহাট বাজার ঘিরে ছোট বড় বেশ কয়েকটি মার্কেটও গড়ে ওঠেছে। এগুলো ব্যক্তি মালিকানাধীন। মূল বহদ্দারহাট সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণাধীন। প্রতিবছর এ হাটের ইজারা মূল্য বাড়লেও ক্রেতা-বিক্রেতার সুযোগ-সুবিধা বাড়ে না।

প্রতিদিন সকাল-বিকেল-রাত্রি কয়েক হাজার ক্রেতা নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্য সংগ্রহে বহদ্দারহাটে আসেন। শুষ্ক মৌসুমে বাজার বা সওদাপাতি কেনায় তেমন সমস্যা না হলেও বর্ষায় কাদাপানিতে থকথকে অবস্থা বিরাজ করে। অথচ প্রতিবছর কোটি টাকার অধিক মূল্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন বাজারটি ইজারা দেয়।

বহদ্দারহাটে প্রবেশের দুপাশে রাস্তায় মাংস, মুরগি, মাছ ও শুঁটকিসহ বিভিন্ন অস্থায়ী দোকান রয়েছে। এসব দোকানের কারণে হাঁটার রাস্তা অনেক সরু হয়ে গেছে। এ পথে দুজনের একসঙ্গে চলতে সমস্যা হয়। বেশি সমস্যায় পড়েন নারীরা। সংকীর্ণ পথের সুযোগ নিয়ে দুষু্ব প্রকৃতির কিছু লোক নারীদের গায়ে ধাক্কা দেয়, অশ্লীল কথা বলে। কেউ এসবের প্রতিবাদ করতে পারে না। মাঝে-মধ্যে কেউ প্রতিবাদ করলে বিক্রেতাদের সংঘবদ্ধতার কারণে অভিযোগকারীকে উল্টো হেনস্তা হতে হয়।

বহদ্দারহাটে বিশেষ করে মাংসের দোকানে আগের দিনের বাসি মাংস বিক্রি, ওজনে কম দেওয়াসহ মাংস বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের কমতি নেই। মুরগির দোকানেও ওজন নিয়ে অভিযোগের পাশাপাশি মুরগি ড্রেসিং করার নামে কৌশলে মরা মুরগি চালান করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ওজন নিয়েও অনেক কথা আছে। একই ধরনের অভিযোগ মাছের দোকানেও।

বহদ্দারহাটের বেশ কয়েকজন মাংস, মাছ ও মুরগি বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাছ, মাংস ও মুরগি বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ ওঠলেও সব বিক্রেতা কিন্তু এমন নয়। কিছু বিক্রেতার কারণে পুরো বাজারের বিক্রেতাদের দুর্নাম হচ্ছে। বিক্রেতারা জানান, আগে এক সময় এই ধরনের ঘটনা ঘটত। এখন তেমন একটা হয় না। যারা এই দুই নম্বরী করে তারা একদিন ধরা পড়ে যায়। পরে এখানে ব্যবসা ছেড়ে অন্য স্থানে চলে যায়। তবে বাজারের সবজি বিক্রেতার বিরুদ্ধে অভিযোগের মাত্রা তুলনামূলক কম।

জানা গেছে, ১৯৯৭-৯৮ সালে বহদ্দারহাটে তৎকালীন মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী মাছ, মাংস ও সবজির জন্য লম্বা একটি পাকা টিনশেড ফ্লোর নির্মাণ করে দিয়েছিলেন। ২০১১-১২ সালে বহদ্দারহাট কাঁচাবাজারের ক্রেতা-বিক্রেতাদের সুবিধার্থে ওই টিনশেড ফ্লোর ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেন তৎকালীন মেয়র মনজুরুল আলম মনজু। ওই সময় দোকান বরাদ্দের জন্য প্রতি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৭০ হাজার টাকা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। অগ্রিম আদায় করা হয় ৫০ হাজার টাকা। বাকি ২০ হাজার টাকা দোকান হস্তান্তরের সময় দেওয়ার শর্ত রাখা হয়। সেই বহুতল ভবন নির্মাণাধীন অবস্থায় এখনো রয়েছে। দীর্ঘদিন পর গত ফেব্রুয়ারি মাসে বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের বৈঠকের পর ভবনের কাজ নতুন করে শুরু হয়। তবে এ জন্য আবারও ব্যবসায়ীদের দিতে হচ্ছে সাড়ে ১৭ হাজার টাকা করে। এই ভবনের নির্মাণকাজ আগামী ৬/৭ মাসের মধ্যে সম্পন্ন হবে বলে আশ্বস্ত করেছেন মেয়র। ভবনের কাজ শেষ হলে বিক্রেতা ও ক্রেতা সাধারণের অনেক সুবিধা হবে বলে জানান দোকান মালিক সমিতির সভাপতি। -কালের কণ্ঠ

আপনার মতামত দিন...

ক্যালেন্ডার এবং আর্কাইভ

Open

Close